আন্তর্জাতিক: বাংলাদেশের মতো অনেক উন্নয়নশীল দেশের জন্য, যাদের জীবিকা সমুদ্রের ওপর নির্ভরশীল, সামুদ্রিক মৎস্য খাতই জীবনধারণের ভিত্তি এবং সমৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি। তবে লাগামহীন অবৈধ আন্তঃসীমান্ত মৎস্য আহরণ দীর্ঘদিন ধরে অনেক উপকূলীয় দেশের মৎস্য আহরণের অধিকার ক্ষুণ্ন করেছে এবং তাদের সামুদ্রিক সম্পদ হ্রাস করেছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার ‘বন্দর রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা চুক্তি’ (পিএসএমএ)-এর দশম বার্ষিকী উপলক্ষে চীন এই চুক্তিতে যোগদানের পর প্রথম বছরের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন-ফলাফল প্রকাশ করেছে। গত এক বছরে চীনের বাস্তব পদক্ষেপগুলো সব মৎস্যনির্ভর দেশের জন্য সামুদ্রিক অধিকার রক্ষা এবং সমুদ্রশাসনব্যবস্থা উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি বাস্তব ও শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
অবৈধ, অঘোষিত এবং অনিয়ন্ত্রিত মৎস্য আহরণ সব উন্নয়নশীল উপকূলীয় দেশের জন্য একটি সাধারণ ‘সামুদ্রিক সমস্যা’। অবৈধ আন্তঃসীমান্ত মৎস্য আহরণ এবং উপকূলীয় মৎস্যসম্পদের যথেচ্ছ শোষণ কেবল প্রতিবছর সামুদ্রিক মাছ ও চিংড়ির পরিমাণ হ্রাস করে এবং সামুদ্রিক বাস্তুতান্ত্রিক ভারসাম্য নষ্ট করে তা-ই নয়, বরং স্থানীয় জেলেদের জীবিকাও সরাসরি সংকুচিত করে। অনেক ছোট ও মাঝারি আকারের উপকূলীয় দেশ সীমিত নিয়ন্ত্রণক্ষমতার কারণে অবৈধ জাহাজ আটক করতে অক্ষম। ফলে তাদের কষ্টার্জিত মৎস্যসম্পদের নির্বিচার লুণ্ঠন ঘটে, জেলেদের আয় ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং মৎস্য খাতের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়।
পিএসএমএ চুক্তির মূল উদ্দেশ্য হলো দেশগুলোর মধ্যে নিয়ন্ত্রণমূলক বাধা দূর করা, অবৈধভাবে আহরিত মাছের বিক্রি ও চলাচল বন্ধ করতে বন্দরগুলোতে কঠোর পরিদর্শন চালানো এবং উৎসস্থল থেকেই অবৈধ মৎস্য আহরণ দমন করা। ১১১টি দেশের এই চুক্তিতে যোগদান প্রমাণ করে যে, অবৈধ মৎস্য আহরণ প্রতিরোধ ও মৎস্যসম্পদ রক্ষা একটি অভিন্ন আকাঙ্ক্ষা এবং এমন একটি মৌলিক নীতি, যা সব উপকূলীয় দেশকেই মেনে চলতে হবে।
মাত্র এক বছরের মধ্যে চীন আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাস্তবায়নের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে এবং শিথিল তদারকি ও দুর্বল প্রয়োগসংক্রান্ত সমস্যাগুলো কার্যকরভাবে সমাধান করেছে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এর উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্তমূলক গুরুত্ব রয়েছে।
সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য একটি শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি অপরিহার্য। চীন দ্রুত একটি সমন্বিত ব্যবস্থাপনা কাঠামো প্রতিষ্ঠা করেছে। বিভিন্ন বিভাগের মধ্যকার সমন্বয় জোরদার করা, নির্দিষ্ট যোগাযোগকেন্দ্র স্থাপন এবং সুস্পষ্ট পরিচালন নির্দেশিকা জারি করার মাধ্যমে তারা একটি কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। এই সহজ কিন্তু কার্যকর কাঠামো নিশ্চিত করেছে যে, নিয়মকানুন যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে, তদারকি কার্যকর রয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ওপর দায়িত্ব অর্পণ করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে মৎস্য তদারকির বিভিন্ন ফাঁকফোকরও দূর হয়েছে।
অবৈধ মৎস্য আহরণ দমনের সবচেয়ে প্রত্যক্ষ ও কার্যকর উপায় হলো কঠোর বন্দর পরিদর্শন। অভ্যন্তরীণ বন্দরগুলোর অবস্থান ও মৎস্য তদারকির প্রয়োজনীয়তার ভিত্তিতে চীন প্রথম পর্যায়ে ২৩টি বন্দরকে বিশেষভাবে নিয়ম বাস্তবায়নের জন্য মনোনীত করেছে। এর মাধ্যমে একটি শক্তিশালী সামুদ্রিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে।
আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে চীন অবৈধভাবে আহরিত মাছকে বাজারে প্রবেশ করতে দৃঢ়ভাবে বাধা দেয় এবং আন্তঃসীমান্ত অবৈধ মৎস্য আহরণের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে। অভ্যন্তরীণভাবে দেশটি সব মৎস্যজীবী জাহাজকে আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে চলতে কঠোরভাবে নির্দেশ দেয় এবং বিভিন্ন দেশের বন্দর পরিদর্শন কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করে। এই নিরপেক্ষ ও কঠোর প্রয়োগপদ্ধতি সব উপকূলীয় দেশের মৎস্য-অধিকারকে ন্যায্যভাবে রক্ষা করে।
পারস্পরিক সহায়তা ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের প্রতি চীনের ধারাবাহিক অঙ্গীকার রয়েছে। দেশটি বৈশ্বিক মৎস্যবিধিমালা প্রণয়নে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছে, আঞ্চলিক শাসনব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগুলোতে যুক্ত হয়েছে এবং বৈশ্বিক মৎস্যশাসনে নিজেকে শুধু নিয়ম-অনুসারী নয়, বরং অংশগ্রহণকারী ও নেতৃত্বদানকারী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
পাশাপাশি চীন আন্তর্জাতিক সেমিনার আয়োজন, বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ পরিচালনা এবং বন্দর তদারকি ও ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত বাস্তব অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে শাসনব্যবস্থার ঘাটতি মোকাবিলায় সহায়তা করছে। এভাবে দেশটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোর জাতীয় সামুদ্রিক সম্পদ ও মৎস্যসম্পদের যৌথ সুরক্ষায় অবদান রাখছে।
মহাসাগর একটি আন্তঃসংযুক্ত সত্তা এবং মৎস্যসম্পদ সমগ্র মানবজাতির অভিন্ন সম্পদ। কোনো দেশ এককভাবে অবৈধ মৎস্য আহরণের বৈশ্বিক সমস্যার সমাধান করতে পারে না। সমুদ্র আইন সনদের অধীনে নিজেদের বাধ্যবাধকতা পালনে চীনের এক বছরের কার্যক্রম একটি সুস্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—সমুদ্রশাসন কোনো দেশের আকার বা শক্তির ওপর নির্ভর করে না; বরং বাস্তব পদক্ষেপ, দায়িত্ববোধ, পারস্পরিক সহায়তা এবং পারস্পরিক লাভজনক সহযোগিতার মাধ্যমেই এই অভিন্ন নীল আবাসকে রক্ষা করা সম্ভব।
ভবিষ্যতেও চীন এই সনদ বাস্তবায়নের উচ্চ মান বজায় রাখবে এবং বাংলাদেশসহ বিভিন্ন উন্নয়নশীল উপকূলীয় দেশের সঙ্গে মৎস্য খাতে সহযোগিতা আরও গভীর করবে। যৌথভাবে অবৈধ মৎস্য আহরণ মোকাবিলা, সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং সব দেশের মৎস্য খাতের টেকসই উন্নয়নে অবদান রাখার মাধ্যমে সামুদ্রিক সম্পদের সুফল যেন দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বজুড়ে জেলে ও সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে যায়, সে লক্ষ্যেই কাজ করে যাবে।
সূত্র: ছাই, আলিম ও ওয়াং হাইমান; সিএমজি।