মঙ্গলবার, জুন ২, ২০২৬
  
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
শিরোনাম :

   আন্তর্জাতিক
মুরের সূত্রের বিকল্প ‘থাও সূত্র`, আগামী দশকে বদলে যেতে পারে প্রযুক্তির বিশ্ব
  Date : 02-06-2026
Share Button

আন্তর্জাতিক: সম্প্রতি হুয়াওয়ের সেমিকন্ডাক্টর বিজনেস গ্রুপের প্রেসিডেন্ট হে থিংপো আনুষ্ঠানিকভাবে ‘থাও (τ) সূত্র’ প্রবর্তন করেছেন, যা দ্রুত বৈশ্বিক প্রযুক্তি মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। আপনারা হয়তো ভাবতে পারেন, এই সূত্রটি আবার কী, আর এর সঙ্গে আমাদের কী সম্পর্ক? হুয়াওয়ের এই থাও সূত্রকে অবহেলা করবেন না, কারণ আগামী ১০ বছরে এটি সত্যিই আমাদের সবার জীবন বদলে দিতে পারে।

প্রথমত, থাও সূত্র কী?
আমরা সবাই জানি, পুরো সেমিকন্ডাক্টর চিপ শিল্পে গত অর্ধশতাব্দী ধরে ইন্টেলের প্রতিষ্ঠাতা গর্ডন মুরের প্রবর্তিত ‘মুর সূত্র’ মেনে চলা হয়েছে। অর্থাৎ, চিপের ট্রানজিস্টরের সংখ্যা প্রতি ১৮–২৪ মাসে দ্বিগুণ হয়; একই সঙ্গে পারফরম্যান্সও দ্বিগুণ হয়, আর খরচ প্রায় অপরিবর্তিত থাকে।

এর আগে চিপ নির্মাতারা শুধু ট্রানজিস্টর ছোট করলেই কম খরচে বেশি পারফরম্যান্স পেতেন। কিন্তু এখন তা প্রায় সীমায় পৌঁছে গেছে। ৩ ন্যানোমিটারের নিচের প্রক্রিয়ায় খরচ জ্যামিতিক হারে বেড়ে যাচ্ছে। একটি ৩ ন্যানোমিটার চিপ কারখানা তৈরি করতে ৩০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত লাগতে পারে, আর একটি ইইউভি (EUV) লিথোগ্রাফি মেশিনের দাম প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলার। এই খরচ শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদেরই বহন করতে হয়। ফলে আমরা দেখছি, গাড়ি বা গৃহস্থালি যন্ত্রপাতির দাম কমলেও মোবাইল ফোন, বিশেষ করে ফ্ল্যাগশিপ ফোনগুলোর দাম বেড়েই চলেছে।

‘থাও সূত্র’ এই খেলার নিয়ম পুরোপুরি বদলে দিচ্ছে। এটি ‘ট্রানজিস্টর ছোট করা’র পথ ছেড়ে ‘সময়ের সংক্ষেপণ’-এর মাধ্যমে ‘জ্যামিতিক সংক্ষেপণ’-এর বিকল্প প্রস্তাব করছে। ‘লজিক ফোল্ডিং’ হলো থাও সূত্র বাস্তবায়নের মূল প্রযুক্তি, যা চিপের দ্বিমাত্রিক সমতল বিন্যাসের সীমাবদ্ধতা ভেঙে সমতল সার্কিটকে বহুস্তরীয় কাঠামোয় ‘ভাঁজ’ করে। এর ফলে মূল সংকেতের পরিবহন পথ সংক্ষিপ্ত হয় এবং পরিবহনজনিত ক্ষতি কমে।

সহজ ভাষায় বললে, চিপকে যদি একটি শহরের সঙ্গে তুলনা করি, তাহলে চিপের পারফরম্যান্স হলো ওই শহরের পরিবহন সক্ষমতা। মুরের সূত্রের নিয়মে শহরের পরিবহন ক্ষমতা বাড়াতে হলে শহরে আরও বেশি গাড়ি ঢোকাতে হয়, আর জায়গা ফুরিয়ে গেলে গাড়ির আকার ছোট করতে হয়। কিন্তু যখন গাড়ি এত ছোট হয়ে যায় যে আর ছোট করা সম্ভব নয়, আর সব রাস্তা ঠাসা হয়ে যায়, তখন মুরের সূত্র তার সীমায় পৌঁছে যায়।

তাই শহরের পরিবহন ক্ষমতা বাড়াতে হলে আর গাড়ির আকার বা সংখ্যা নিয়ে না ভেবে দক্ষতার দিকে নজর দিতে হবে। যেমন—উড়ালসড়ক নির্মাণ, রিং রোড তৈরি, ট্রাফিক সিগন্যালের সমন্বয় এবং যানজটপ্রবণ পয়েন্টগুলোর উন্নয়ন; যাতে গাড়িগুলো দ্রুত চলতে পারে এবং সামগ্রিক পরিবহন সক্ষমতা বাড়ে। এটাই হলো জ্যামিতিক সঞ্চয়ের পরিবর্তে সময়ভিত্তিক দক্ষতার ব্যবহার।

তাহলে সাধারণ মানুষের জন্য এর অর্থ কী?

এর অর্থ হলো, ভবিষ্যতে আমাদের ‘সবচেয়ে উন্নত প্রক্রিয়া’র জন্য বাড়তি মূল্য দিতে হবে না। বর্তমানের প্রচলিত প্রযুক্তি ব্যবহার করেও একই ক্ষমতার চিপ তৈরি করা যাবে। ফলে মোবাইল ফোন, কম্পিউটারসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক পণ্যের দাম কমবে।

এ ছাড়া হুয়াওয়ে শুধু তত্ত্বেই থেমে নেই। গত ছয় বছরে থাও সূত্রের ভিত্তিতে তারা ৩৮১টি চিপ ডিজাইন ও উৎপাদন করেছে। এ বছরের শরতে আসা নতুন কিরিন মোবাইল চিপে সম্পূর্ণ লজিক ফোল্ডিং প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। হুয়াওয়ের অনুমান অনুযায়ী, ২০৩১ সালের মধ্যে থাও সূত্রভিত্তিক উচ্চক্ষমতার চিপের ট্রানজিস্টর ঘনত্ব ১.৪ ন্যানোমিটার প্রক্রিয়ার সমতুল্য হবে। ততদিনে একই ক্ষমতার কম্পিউটার ও মোবাইল ফোনের দাম অনেকটাই কমে যাবে।

শুধু মোবাইল সস্তা হবে না, এআইয়ের কার্যকারিতাও ব্যাপকভাবে বেড়ে যাবে। কারণ থাও সূত্র দক্ষতা, সমন্বয় এবং প্রান্ত-থেকে-প্রান্ত কার্যকর করার সময় কমিয়ে আনার ওপর জোর দেয়। অর্থাৎ, কম্পিউটিং খরচ অনেক কমে যাবে। ভবিষ্যতে ক্লাউডভিত্তিক বড় মডেলগুলো আরও সাশ্রয়ী ও দ্রুততর হবে। এমনকি এআই ব্যবহারের জন্য সব সময় নেটওয়ার্কে যুক্ত থাকার প্রয়োজনও নাও হতে পারে। গৃহস্থালি যন্ত্রপাতিতেও স্থানীয়ভাবে এআই সংযুক্ত করা যাবে। স্মার্ট ড্রাইভিংও আরও সাশ্রয়ী হবে, কারণ গাড়ির চিপের দাম কমবে এবং কর্মক্ষমতা বাড়বে। ফলে শুধু ফ্ল্যাগশিপ মডেল নয়, তুলনামূলক সাশ্রয়ী গাড়িতেও স্মার্ট ড্রাইভিং সিস্টেম ব্যবহার করা সম্ভব হবে।

এই পদ্ধতিগত সমন্বয় ও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা এসেছে চীনের বিশ্বের সবচেয়ে সম্পূর্ণ শিল্প কাঠামো এবং সবচেয়ে বিস্তৃত প্রয়োগক্ষেত্র থেকে, যা একাধিক স্তরে গভীর সমন্বয় ও অপ্টিমাইজেশন সম্ভব করে। ‘ন্যানোমিটার-স্কেলের উন্নত প্রক্রিয়া’কে আর একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে না ধরে, হুয়াওয়ের প্রস্তাবিত ‘থাও সূত্র’ এআই বিকাশের জন্য একটি নতুন আন্তর্জাতিক ধারা তৈরি করতে পারে। পাশাপাশি এটি পাশ্চাত্যের দীর্ঘদিনের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে একটি উদ্ভাবনী ও কার্যকর চীনা সমাধান উপস্থাপন করেছে।

সূত্র: স্বর্ণা, তৌহিদ ও লিলি; চায়না মিডিয়া গ্রুপ।



  
  সর্বশেষ
কান উৎসবে চীনা সিনেমার বহুমাত্রিক উত্থান, বাড়ছে আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা
মুরের সূত্রের বিকল্প ‘থাও সূত্র`, আগামী দশকে বদলে যেতে পারে প্রযুক্তির বিশ্ব
‘নব্য সামরিকবাদ` আত্মঘাতী পথ, জাপানকে সতর্ক করল চীন
মহাকাশযাত্রায় হংকংয়ের অংশগ্রহণে গর্ব, বিজ্ঞান গবেষণায় নতুন উদ্দীপনা

প্রকাশক ও সম্পাদক : ফাতেমা ইসলাম তানিয়া
সম্পাদক কর্তৃক বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস ২১৯ ফকিরেরপুল ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত ।
২১৯ ফকিরেরপুল (১ম গলি ২য় তলা), মতিঝিল ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত । মোবাইল : ০১৮৩৪-৮৯৮৫০৪ ই-মেইল :
E-mail : alordiganto2021@gmail.com