মাটির প্রচলিত প্রতিমার বাইরে এবার সাতক্ষীরায় শারদীয় দুর্গোৎসবে দেখা যাবে ব্যতিক্রমী এক আয়োজন। দেড় লাখের বেশি দিয়াশলাই কাঠি ও ১০ কেজির বেশি রেশমি সুতা দিয়ে তৈরি হচ্ছে দুর্গা প্রতিমা। সাতক্ষীরা সদরের ব্রহ্মরাজপুর সর্বজনীন শ্রী শ্রী দুর্গা মন্দিরে তৈরি হচ্ছে এই প্রতিমা। ব্যতিক্রমী আয়োজন দেখতে এরই মধ্যে মন্দির প্রাঙ্গণে ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা।
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে মন্দির প্রাঙ্গণে গিয়ে দেখা যায়, মাটির তৈরি প্রতিমার অবয়বের ওপর একে একে বসানো হচ্ছে দিয়াশলাইয়ের কাঠি। পাশাপাশি নকশায় ব্যবহার করা হচ্ছে রেশমি সুতা। প্রতিটি অংশে নিখুঁতভাবে কাঠি বসাতে ব্যস্ত শিল্পীরা। সামান্য ভুলে নকশা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকায় কাজটি করতে হচ্ছে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে।
মন্দির পরিচালনা কমিটির উপদেষ্টা কাকাই লাল সাহা জানান, প্রতিমা তৈরির মূল কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। সোমবার থেকে রঙের কাজ শুরু হবে।
প্রতিমাশিল্পী নবদ্বীপ সরকার জানান, ২০২৩ সালে কলকাতায় গিয়ে দিয়াশলাই কাঠি দিয়ে এ ধরনের প্রতিমা তৈরির কাজ দেখেছিলেন তিনি। সেখান থেকেই এবার সাতক্ষীরায় ব্যতিক্রমী প্রতিমা তৈরির পরিকল্পনা করেন।
তার ভাষ্য, চারজন শিল্পী দিন-রাত কাজ করছেন। অনেক সময় রাত দুইটা থেকে তিনটা পর্যন্ত কাজ চালিয়ে যেতে হচ্ছে। এবার সাতক্ষীরার পাশাপাশি কুষ্টিয়াসহ চারটি স্থানে দুর্গা প্রতিমা তৈরির দায়িত্ব পেয়েছেন তিনি।
দিয়াশলাইয়ের কাঠির মাথায় থাকা দাহ্য উপাদানের কার্যকারিতা কমাতে বিশেষ ধরনের আঠা ব্যবহার করা হয়েছে বলেও জানান এই শিল্পী।
ব্রহ্মরাজপুর সর্বজনীন শ্রী শ্রী দুর্গা মন্দির পরিচালনা কমিটির সহকারী কোষাধ্যক্ষ অমিত কুমার ঘোষ জানান, প্রতিমা তৈরিতে দেড় লাখের বেশি দিয়াশলাই কাঠি এবং ১০ কেজির বেশি রেশমি সুতা ব্যবহার করা হচ্ছে। শুধু প্রতিমাশিল্পীদের পারিশ্রমিক ধরা হয়েছে প্রায় এক লাখ ৩০ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে এবারের দুর্গাপূজার আয়োজনের ব্যয় প্রায় পাঁচ লাখ টাকা।
তার ভাষ্য, জমিদার পশুপতি মিত্রের উদ্যোগে শুরু হওয়া এই দুর্গাপূজা দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। ব্রহ্মরাজপুরে ব্যতিক্রমী প্রতিমার আয়োজনও নতুন নয়। গত বছর প্রায় ১০০ কেজি চিনিগুঁড়া ধান ব্যবহার করে প্রতিমা তৈরি করা হয়েছিল। সেই প্রতিমা দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে দর্শনার্থীরা এসেছিলেন। সেই সাড়া থেকেই এবার নতুন কিছু করার উদ্যোগ নেয় পূজা উদযাপন কমিটি।
দিয়াশলাই কাঠির ব্যবহার নিয়ে দাহ্যতার প্রশ্ন ওঠায় নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখছে প্রশাসন ও পূজা কমিটি। পুরো মন্দির এলাকা সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে।
ব্রহ্মরাজপুর সর্বজনীন শ্রী শ্রী দুর্গাপূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি আইনজীবী গৌতম কুমার বিশ্বাস জানান, গত ১৬ সেপ্টেম্বর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অর্ণব কুমার দত্ত, সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মাহামুদুর রহমান এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের একজন কর্মকর্তা মন্দির এলাকা ও প্রতিমার নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন।
তার কথায়, প্রতিমাশিল্পী ও কমিটির সদস্যদের উপস্থিতিতে দাহ্যতার বিষয়টি পরীক্ষা করে দেখাও হয়েছে। দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার পাশাপাশি পূজাকে ঘিরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে ব্রহ্মরাজপুর এলাকায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এবারও স্থানীয় বাসিন্দা, পূজা কমিটি ও প্রশাসনের সমন্বয়ে নিরাপদ পরিবেশে উৎসব আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে।
সাতক্ষীরা জেলাজুড়েও দুর্গাপূজা ঘিরে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ সাতক্ষীরা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক বিশ্বনাথ ঘোষ জানান, গত বছর জেলায় ৫৮৭টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এবার পূজা হবে ৫৯০টি মণ্ডপে।
তিনি জানান, আগামী ১০ অক্টোবর মহালয়ার মধ্য দিয়ে দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। ১৭ অক্টোবর মহাষষ্ঠী এবং ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীর মধ্য দিয়ে শেষ হবে শারদীয় দুর্গোৎসব।