শনিবার, আগস্ট ১৫, ২০২৬
  
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
শিরোনাম :

   আন্তর্জাতিক
খাদ্য, মানবতা ও শান্তির অনন্য বার্তা নিয়ে চীনা চলচ্চিত্র
  Date : 15-08-2026
Share Button

আন্তর্জাতিক: একজন সাধারণ দর্শক হিসেবে শেন থেংয়ের কমেডি সিনেমা দেখার হালকা প্রত্যাশা নিয়েই প্রেক্ষাগৃহে ঢুকেছিলাম। কিন্তু সিনেমা শেষ হওয়ার পর বেরিয়ে এলাম অনেকক্ষণ নীরব থেকে। বাইরে রাস্তায় গাড়ির ভিড়, রেস্তোরাঁয় নিশ্চিন্তে খাবার খেতে থাকা মানুষজন—হঠাৎ মনে হলো, চারপাশের সব যেন আগের মতো নেই।

এই সিনেমা কোনো বীরগাথা নয়। যুদ্ধের মাঝে আটকেপড়া এক সাধারণ চীনা রাঁধুনির সংগ্রাম, ভয়, দুর্বলতা এবং একের পর এক সিদ্ধান্তের গল্প। আর সাধারণ এই মানুষটির দৃষ্টিভঙ্গিই আমাকে যুদ্ধ ও খাদ্য—এই দুইয়ের মধ্য দিয়ে চীনের এক অনন্য জীবনদর্শনের মুখোমুখি করেছে।

কামান ও চুলা: দুই আগুনের মুখোমুখি

সিনেমার গল্প জটিল নয়। চীনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাঁধুনি সুই ফু ঋণ শোধ করতে মধ্যপ্রাচ্যে পাড়ি জমান এবং ‘ড্রাগন রেস্তোরাঁয়’ কাজ নেন। অপ্রত্যাশিতভাবে সেখানে যুদ্ধ শুরু হয়। শহর পরিণত হয় ধ্বংসস্তূপে। নানা কারণে সুই ফু সেখানেই থেকে যান।

এরপর তার জীবনকে ঘিরে থাকে দুই ধরনের আগুন—জানালার বাইরে কামানের আগুন আর রান্নাঘরের চুলার আগুন। পরিচালক একের পর এক দৃশ্যের মাধ্যমে এই দুই আগুনকে পাশাপাশি হাজির করেছেন।

এক মুহূর্তে দেখা গেল রান্নাঘরে ধোঁয়া উঠছে। লোহার কড়াইয়ে রান্নার সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে। পরের মুহূর্তে রাস্তায় বোমা বিস্ফোরিত হচ্ছে। রেস্তোরাঁর ভেতরে খদ্দেররা কুং পাও চিকেনের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে আছে, আর বাইরে শহরে ঢুকে পড়ছে ট্যাংক।

আমাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে এই বৈপরীত্য। সিনেমাটি কোনো করুণার আবহ তৈরি করতে চায়নি; যুদ্ধের ভয়াবহ বাস্তবতাকে নিজের ভাষাতেই ফুটিয়ে তুলেছে।

সিনেমার মাঝামাঝি একটি অংশও মনে দাগ কাটে। দিনের বেলা ‘ড্রাগন রেস্তোরাঁ’ হয়ে ওঠে গরম খাবারের ক্যান্টিন, আর রাতে সেটিই সৈন্য ও সাংবাদিকদের মদের নেশায় ডুবে থাকার আন্ডারগ্রাউন্ড বার। বাইরে গোলাগুলি, ভেতরে আলো-আঁধারির মাতলামি।

পরিচালক এ সিনেমায় কাউকে ভালো বা মন্দ হিসেবে বিচার করেননি। শুধু দৃশ্যগুলো দর্শকের সামনে তুলে ধরেছেন। তখন নিজের অজান্তেই মনে হয়—যুদ্ধের চরম বাস্তবতার মধ্যেও মানুষ কখনও কখনও শুধু একটি ভালো খাবার খেয়েই বেঁচে থাকার বোধটুকু ধরে রাখতে পারে।

‘ভালো করে খাও’: চীনের সরল জীবনবোধ

সিনেমায় বারবার একটি সংলাপ শোনা যায়—‘সময়মতো খাবার খাও।’ প্রথমবার শুনলে সাধারণ পারিবারিক উপদেশ বলেই মনে হয়। কিন্তু যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে কথাটির অর্থ সম্পূর্ণ বদলে যায়।

সুই ফু কেমন মানুষ? তিনি জন্মগত কোনো সাধু নন। তিনি হিসাব করতে জানেন, ভয় পান, বেশি টাকা উপার্জনের জন্য নিষিদ্ধ মদও বিক্রি করেন। এমনকি ঋণ শোধ করার মতো টাকা জমিয়ে লোভের কারণে তা ছাড়তে পারেননি। পরিচালক তাকে নৈতিকভাবে নিখুঁত কোনো বীর হিসেবে নির্মাণ করেননি। বরং তাকে দেখিয়েছেন স্বার্থপরতা, ভয় ও দুর্বলতায় ভরা একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে।

কিন্তু এই সাধারণ মানুষটিই যুদ্ধের নিষ্ঠুরতার মুখে বারবার অসাধারণ কিছু সিদ্ধান্ত নেন। সিনেমার সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী অংশগুলোর একটি হলো এতিমখানার শিশুদের আশ্রয় দেওয়ার ঘটনা। কেউ তাকে বলে, ‘ওরা তো তোমার সন্তান নয়, অযথা ঝামেলায় জড়িয়ো না।’

সুই ফুর উত্তর সহজ—‘ওরাও তো বাচ্চা।’ এই একটি কথাই যেন সুই ফুর চরিত্রের সারমর্ম বলে দেয়।

বিশটিরও বেশি এতিম শিশুকে রেস্তোরাঁয় আশ্রয় দেন সুই ফু, যে শিশুগুলো যেকোনো সময় চরমপন্থী সংগঠনের হাতে পড়ে আত্মঘাতী বোমারুতে পরিণত হতে পারত। সুই ফু তাদের কাজ শেখান, আশ্রয় দেন এবং অন্তত একবেলা গরম খাবারের নিশ্চয়তা দেন।

‘ভালো করে খাও’—চীনা সংস্কৃতিতে কথাটি শুধু ক্ষুধা মেটানোর বিষয় নয়। এর মধ্যে জীবনকে মূল্য দেওয়ার এক গভীর দর্শন রয়েছে। যেন বলা হচ্ছে—যাই ঘটুক না কেন, জীবনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

চীনা সংস্কৃতিতে বহুল প্রচলিত ধারণা—‘মানুষের কাছে খাদ্যই স্বর্গ’। একবেলা গরম খাবার তাই শুধু খাবার নয়; এটি মর্যাদা, আশা এবং ভয় ও হতাশা থেকে মানুষকে ফিরিয়ে আনার শক্তি। শান্তির সময়ে এটি দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু যুদ্ধের সময়ে এক বেলার গরম খাবার মানে বিলাসিতা কিংবা বেঁচে থাকার শেষ আশ্রয়।

কোনো পক্ষের হয়ে নয়: ঘৃণার ঊর্ধ্বে এক মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি

সিনেমাটির আরেকটি বিষয় আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে—এটি সহজে কোনো পক্ষ নেয়নি। মার্কিন সেনা, সশস্ত্র যোদ্ধা, স্থানীয় মানুষ কিংবা এতিম শিশু—কাউকেই সিনেমা ঢালাওভাবে ‘ভালো’ বা ‘খারাপ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি।

সুই ফুর দৃষ্টিভঙ্গিও বিভ্রান্তিতে ভরা। কখনও তার মনে হয় মার্কিন সেনারাই আক্রমণকারী, আবার তিনি সশস্ত্র যোদ্ধাদের নৃশংসতাও দেখেন। শেষ পর্যন্ত তার প্রশ্ন একটাই—তোমরা কীসের জন্য লড়ছো? তোমরা কি থামতে পারো না? বাচ্চাগুলো তো নিরপরাধ!

এই বিভ্রান্তিই চরিত্রটিকে বাস্তব করে তোলে। নিজের দেশ ছেড়ে অন্য দেশে আসা একজন সাধারণ মানুষ যখন নিজের সঙ্গে সম্পর্কহীন একটি যুদ্ধের মুখোমুখি হন, তখন তার প্রথম কাজ কে ঠিক আর কে ভুল তা নির্ধারণ করা নয়। প্রথমে তিনি বাঁচতে চান। আর সামর্থ্য থাকলে অন্যদেরও বাঁচাতে চান।

এ সিনেমায় একটি অর্থপূর্ণ চরিত্র-বৈপরীত্যও রয়েছে। স্থানীয় এতিম সাইফ এবং মার্কিন সেনাবাহিনীর চীনা বংশোদ্ভূত সদস্য টনি ওয়াং পরস্পরকে ঘৃণা করে। সাইফ মার্কিন সেনাদের আক্রমণকারী হিসেবে ঘৃণা করে। অন্যদিকে টনি সাইফকে ঘৃণা করে, কারণ স্থানীয় শিশুদের হামলায় তার সহযোদ্ধারা নিহত হয়েছে।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত টনি বিস্ফোরণে মারা যায়। সাইফও বিস্ফোরণে হারায় তার সবচেয়ে ভালো বন্ধুকে।

ঘৃণা কাউকেই বাঁচাতে পারেনি। বরং তা ডেকে এনেছে আরও মৃত্যু। ঘৃণার এই শৃঙ্খলের মধ্যে সুই ফুর অবস্থান তাই স্বতন্ত্র। তিনি কোনো পক্ষের নন। তার অস্ত্র বন্দুক নয়, হাঁড়ি-কড়াই। তার যুদ্ধক্ষেত্র রান্নাঘর। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে তিনি শুধু একটি চুলার আগুন জ্বালান এবং ক্ষুধার্ত শিশুদের জন্য একবেলা গরম খাবার পরিবেশন করেন।

বাংলাদেশের মানুষ যুদ্ধ শব্দটির সঙ্গে অপরিচিত নয়। এ দেশের ইতিহাসে রক্ত ও আগুনের স্মৃতি রয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও শরণার্থী সংকটের মতো অভিজ্ঞতার সঙ্গেও পরিচিত বাংলাদেশ। তাই হয়তো এ দেশের মানুষজন অন্য অনেক দেশের মানুষের চেয়ে ‘শান্তি’ শব্দটির গুরুত্ব একটু বেশি বুঝতে পারে।

এ সিনেমাতেও প্রচ্ছন্ন এক শান্তির বার্তা আছে। তবে এটি কিন্তু বড় বড় বাণী দিয়ে ‘শান্তি কতটা গুরুত্বপূর্ণ’ তা বোঝাতে চায়নি। বরং একজন রাঁধুনি, একবেলা গরম খাবার এবং একদল এতিম শিশুর গল্পের মধ্য দিয়ে দর্শক নিজেই অনুভব করতে পেরেছে—যুদ্ধের মধ্যেও সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসগুলো আসলে খুবই সরল—নিশ্চিন্তে খাবার খাওয়ার সুযোগ, একটি নিরাপদ ঘুমানোর জায়গা, আর মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার মর্যাদা।

চীনে একটি প্রবাদ আছে—‘চার সমুদ্রের মধ্যে সবাই ভাই।’ এ কথায় রয়েছে এমন এক মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি, যার সারমর্ম হলো দুর্যোগের সময়, মানুষের দুর্বলতার মুহূর্তে, আমরা অন্য মানুষকেও ‘মানুষ’ হিসেবে দেখতে প্রস্তুত। সুই ফু এতিম শিশুদের উদ্দেশে যে কথাটি বলেছিলেন—‘ওরাও তো বাচ্চা।’ এ কথাটিই যেন এই দর্শনের সবচেয়ে সরল প্রকাশ।

আজকের বিশ্বেও যুদ্ধের আগুন জ্বলছে। আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন হয়তো বিশাল রাজনৈতিক কাঠামো নিজের হাতে বদলে দেওয়ার ক্ষমতা আমাদের নেই। কিন্তু প্রত্যেকেরই কিছু করার আছে—কাউকে কষ্ট পেতে দেখলে চোখ ফিরিয়ে না নেওয়া, অন্যের ক্ষুধাকে নিজের ক্ষুধার মতো অনুভব করা, আর যত কঠিন সময়ই আসুক, জীবনের প্রতি আস্থা না হারানো।

শেষ পর্যন্ত ‘ভালো করে খাও’—কথাটি তাই শুধু খাবারের নয়। ভালো খাও, ভালো করে বেঁচে থাকো, অন্যকেও বাঁচতে দাও; এই সিনেমার সবচেয়ে সরল অথচ সবচেয়ে শক্তিশালী মানবিক বার্তা এটিই।

সূত্র: স্বর্ণা-ফয়সল-লিলি, চায়না মিডিয়া গ্রুপ।



  
  সর্বশেষ
খাদ্য, মানবতা ও শান্তির অনন্য বার্তা নিয়ে চীনা চলচ্চিত্র
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নয়নে বিদ্যুৎ গ্রিডে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে চীন
চলচ্চিত্রের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন গড়ছে চীন ও কিরগিজস্তান
শিল্প ও উদ্ভাবনে অর্থায়ন বাড়ানোর পথে চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক

প্রকাশক ও সম্পাদক : ফাতেমা ইসলাম তানিয়া
সম্পাদক কর্তৃক বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস ২১৯ ফকিরেরপুল ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত ।
২১৯ ফকিরেরপুল (১ম গলি ২য় তলা), মতিঝিল ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত । মোবাইল : ০১৮৩৪-৮৯৮৫০৪ ই-মেইল :
E-mail : alordiganto2021@gmail.com