আন্তর্জাতিক: ২০২৬ সাল চীনের কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠার ১০৫তম বার্ষিকী। অনেকেই কৌতূহলী: প্রতিষ্ঠাকালে মাত্র ৫০ জনের মতো সদস্য নিয়ে গঠিত একটি ছোট দল কীভাবে এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে চীনা জনগণ নিয়ে রূপান্তরমূলক পরিবর্তনের এমন এক উন্নয়নমূলক অলৌকিক ঘটনা ঘটিয়েছে যা বিশ্বকে বিস্মিত করেছে!
এর উত্তর নিহিত আছে ১০৫ বছর আগে চীনের চেচিয়াং প্রদেশের শাও সিং নানহু হ্রদের একটি লাল নৌকায়, সেখানেই একটি "স্ফুলিঙ্গ" প্রজ্বলিত হয়েছিল, যাকে চীনা প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং "পার্টি প্রতিষ্ঠার মহান চেতনা" হিসেবে সংক্ষেপে বর্ণনা করেছেন এবং "চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আধ্যাত্মিক উত্স" হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এটিই চীনের আজকের সমস্ত সাফল্যের আধ্যাত্মিক ভিত্তি এবং চীনের ভবিষ্যতের মূল চালিকাশক্তি।
গল্পটি শুরু হয় ১০৫ বছর আগের এক গ্রীষ্মে। ১৯২১ সালে, গড়ে মাত্র ২৮ বছর বয়সী এক ডজন তরুণ-তরুণী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সারাদেশ থেকে শাংহাইয়ের একটি আবাসিক ভবনে সমবেত হন, যেখানে তাঁরা গোপনে প্রথম জাতীয় কংগ্রেস আহ্বান করেন। পরে, তল্লাশি এড়াতে তাঁরা চেচিয়াংয়ের শাও সিং শহরের নানহু হ্রদের একটি ছোট নৌকায় চলে যান। সেই নৌকায়, যা পরে "লাল নৌকা" নামে পরিচিত হয়, তাঁরা তাঁদের প্রথম কর্মসূচি গ্রহণ করেন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। সেই সময় চীন পতনের দ্বারপ্রান্তে ছিল: বিদেশি শক্তিগুলো আক্রমণ করছিল, যুদ্ধবাজরা নিজেদের মধ্যে লড়াই করছিল, এবং বেশিরভাগ মানুষ কেবল পেট ভরে খাওয়ার জন্যই সংগ্রাম করছিল। এই তরুণ-তরুণীরা কোনো সরকারি পদ বা ব্যক্তিগত সম্পদের পেছনে ছুটছিলেন না, বরং তাঁদের একটি সাধারণ বিশ্বাস ছিল: চীনকে মাথা উঁচু করে দাঁড় করানোর এবং চীনা জনগণকে একটি উন্নত জীবন দেওয়ার পথ খুঁজে বের করা। ১০০ বছর পর, ২০২১ সালের ১ জুলাই চীনের শীর্ষ নেতা সি চিন পিং কর্তৃক প্রস্তাবিত ‘দল প্রতিষ্ঠার মহান চেতনা’র সূচনা বিন্দু এটাই। এই চেতনার মূলে রয়েছে, সত্য ও আদর্শকে সমুন্নত রাখা, মূল আকাঙ্ক্ষার চর্চা ও দায়িত্বের ভার গ্রহণ করা, ত্যাগ স্বীকারে নির্ভয়ে সাহসিকতার সাথে সংগ্রাম করা এবং দল ও জনগণের প্রতি অনুগত থাকা।
"সত্য ও আদর্শকে সমুন্নত রাখা" বলতে কী বোঝায়? চীনের কমিউনিস্ট পার্টির অগ্রদূতদের জন্য এর অর্থ ছিল এই দৃঢ় বিশ্বাস যে, মার্কসবাদ চীনকে রক্ষা করতে পারে এবং অবশেষে একটি ন্যায্য ও ন্যায়পরায়ণ নতুন সমাজ প্রতিষ্ঠিত হবে। এই আদর্শের জন্য, ১৯২১ সালে পার্টি প্রতিষ্ঠার সময় থেকে ১৯৪৯ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত, ৩৭ লক্ষেরও বেশি নামধারী বিপ্লবী শহীদ তাঁদের জীবন উৎসর্গ করেছেন এবং আরও অগণিত অখ্যাত বীর স্বেচ্ছায় তাঁদের জীবন দিয়েছেন। তাঁরা সাধারণ মানুষের মতোই, যন্ত্রণাকে ভয় পেতেন এবং জীবনের জন্য আকুল ছিলেন, কিন্তু তাঁদের আদর্শের প্রতি অবিচল অঙ্গীকার এবং ভবিষ্যত্ প্রজন্মকে তাঁদের দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি করতে না দেওয়ার ইচ্ছার কারণে, তাঁরা সাহসের সাথে আত্মত্যাগের পথ বেছে নিয়েছিলেন।
সত্যের প্রতি এই বাস্তবসম্মত আনুগত্য চীনকে পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম করেছে: গণপ্রজাতন্ত্রের প্রথম দিকে শিল্পের ভিত্তি স্থাপন থেকে শুরু করে, সংস্কার ও উন্মুক্তকরণের মাধ্যমে বাজার অর্থনীতিকে গ্রহণ করা, এবং তারপর নতুন যুগে উচ্চ-মানের উন্নয়নের দিকে অগ্রসর হওয়া ও যৌথ সমৃদ্ধিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া পর্যন্ত, প্রতিটি পদক্ষেপই চীনের জাতীয় পরিস্থিতির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ এবং সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়েছে।
“মূল আকাঙ্ক্ষার চর্চা ও দায়িত্বের ভার গ্রহণ করা” কথাটির সহজ অর্থ হলো, চীনের কমিউনিস্ট পার্টি তার প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই "চীনা জনগণের জন্য সুখ অন্বেষণ" করার লক্ষ্যকে তার সত্তার গভীরে প্রোথিত করেছে। এর সবচেয়ে সুস্পষ্ট প্রমাণ হলো চীনের দারিদ্র্য বিমোচনের অলৌকিক ঘটনা: গত ৪০ বছরে, চীনের কমিউনিস্ট পার্টি ৭৭ কোটি চীনা মানুষকে দারিদ্র্য থেকে মুক্ত করেছে-এই সংখ্যাটি সমগ্র ইউরোপের জনসংখ্যার চেয়েও বেশি। এমনকি সবচেয়ে দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলেও, যেখানে মাত্র কয়েকটি পরিবার বাস করে, সেখানে দারিদ্র্য বিমোচন শিল্পের পাশাপাশি রাস্তাঘাট ও বিদ্যুতের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আজ, চীনের মৌলিক স্বাস্থ্য বীমা ১৩০ কোটিরও বেশি মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করে। চিয়াসিং-এ, যেখানে ১০৫ বছর আগে "লাল নৌকা" নোঙর করেছিল, সেখানে এখন কৃষক এবং শহরের বাসিন্দারা প্রায় সমান সামাজিক সুরক্ষা এবং সরকারি পরিষেবা ভোগ করে। শহর ও গ্রামের আয়ের অনুপাত মাত্র ১.৪৮:১, এবং এই অঞ্চলের গ্রামীণ বাসিন্দাদের মাথাপিছু ব্যবহারযোগ্য আয় টানা ২২ বছর ধরে চেচিয়াং প্রদেশে প্রথম স্থান অধিকার করে আছে—এটিই “মূল আকাঙ্ক্ষার চর্চা ও দায়িত্বের ভার গ্রহণ করা” সবচেয়ে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
বন্ধুরা প্রায়শই জিজ্ঞাসা করেন: চীন কেন সবসময় এত বাধা অতিক্রম করে যুগান্তকারী সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে? এর উত্তর নিহিত আছে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির মহান প্রতিষ্ঠাকালীন চেতনার মূলে: “ত্যাগ স্বীকারে নির্ভয়ে সাহসিকতার সাথে সংগ্রাম করা।" বিগত ১০৫ বছর ধরে, "সংগ্রাম" সর্বদাই চীনের কমিউনিস্ট পার্টির একটি মূলমন্ত্র হয়ে রয়েছে: গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের শুরুতে চীনা জনগণ দারিদ্র্য ও পশ্চাত্পদতার মাঝে "দুই বোমা, এক উপগ্রহ" নির্মাণ করেছিল এবং ৮০ হাজারেরও বেশি জলাধার তৈরি করেছিল; সংস্কার ও উন্মুক্তকরণের পর, চীনা জনগণ অন্বেষণ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার সাহস দেখিয়েছিল, একটি বাজার অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করেছিল এবং "বিশ্বের কারখানায়" পরিণত হয়েছিল; নতুন যুগে প্রবেশ করে চীন উচ্চ-প্রযুক্তি ক্ষেত্রে যুগান্তকারী সাফল্য অর্জন করেছে; দেশীয়ভাবে উৎপাদিত বৃহৎ বিমান আকাশে উড়ছে, সৌর ও নতুন শক্তির যানবাহন উৎপাদন বৈশ্বিক মোট উত্পাদনের অর্ধেকেরও বেশি দখল করেছে এবং প্রত্যন্ত গ্রামীণ এলাকাতেও ৫জি সংকেত পৌঁছেছে-এই প্রতিটি পদক্ষেপই অর্জিত হয়েছে সাহসিকতার সাথে লড়াই ও সংগ্রামের মাধ্যমে।
এই কৌশলগত স্থিরতা, যা পরিবর্তন সাধনে বিঘ্নকে বাধা দিতে বাধা দেয়, চীনকে এক উত্তাল বিশ্বে স্থিতিশীলতার এক নোঙরে পরিণত করে এবং বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্য দৃঢ় সমর্থন জোগায়।
"দল ও জনগণের প্রতি অনুগত থাকা” হলো চীনের কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠার মহান চেতনার ভিত্তিপ্রস্তর এবং চীনের রাজনৈতিক যুক্তির মূল কেন্দ্র। চীনের কমিউনিস্ট পার্টির জন্য, "দলের প্রতি আনুগত্য" কখনও কোনো ব্যক্তির প্রতি আনুগত্য ছিল না, বরং জনগণের কাছে করা প্রতিশ্রুতির প্রতি আনুগত্য-যতদিন জনগণের উন্নত জীবনের আকাঙ্ক্ষা পূরণ না হবে, ততদিন দলের প্রচেষ্টা বন্ধ হবে না। জনগণের সাথে এই গভীর সংযোগই চীনের উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে বড় আস্থার উৎস।
রাজনৈতিক শাসনের এই যুক্তি পশ্চিমা বহুদলীয় ব্যবস্থা থেকে মৌলিকভাবে ভিন্ন, যা নির্বাচন চক্রকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়: পশ্চিমা নীতিগুলো প্রায়শই নির্বাচনের উত্থান-পতন এবং স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীগুলোর ক্ষমতার দ্বন্দ্ব দ্বারা প্রভাবিত হয়, অপরদিকে চীনের `দলের প্রতি আনুগত্য`-এর উপর জোর দেওয়া চূড়ান্তভাবে জনগণের মৌলিক স্বার্থের দিকেই নির্দেশ করে।
স্বল্পমেয়াদী নির্বাচনী রাজনীতির সীমাবদ্ধতা থেকে নিজেকে মুক্ত করে চীন কয়েক দশকব্যাপী উন্নয়ন পরিকল্পনা নিরবচ্ছিন্নভাবে বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হয়েছে এবং কৌশলগত ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করেছে।
চীনের কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠার মহান চেতনা কেবল বইয়ে লেখা একটি বিমূর্ত ধারণা নয়। ১০৫ বছর পরে, এটি চীনা জীবনের এক মূর্ত অংশে পরিণত হয়েছে, যা ইতিহাসকে রূপ দিচ্ছে এবং জীবনকে বদলে দিচ্ছে-এটি চীনাদের দৈনন্দিন জীবনের একটি অংশ।
বিশ্বের জন্য, কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠার মহান চেতনা সিসিপি-র কোনো স্ব-সংকেতবদ্ধ কোড নয়। এটি সমগ্র মানবজাতির একটি উন্নততর জীবন অন্বেষণের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ: এমন একদল মানুষ যারা অভিন্ন আদর্শ ধারণ করে, প্রতিকূলতাকে ভয় পায় না এবং সংখ্যাগরিষ্ঠের সুখের জন্য সংগ্রাম করে। এই ধরনের চেতনা যেকোনো দেশে এবং যেকোনো সংস্কৃতিতে সম্মানিত ও স্বীকৃত হবে।
সূত্র :রুবি-তৌহিদ-লাবণ্য,চায়না মিডিয়া গ্রুপ।