চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) ২০তম কেন্দ্রীয় কমিটির পঞ্চম পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফলাফলগুলোর একটি হলো—‘দলের ব্যাপক ও কঠোর শাসন অবিচলভাবে এগিয়ে নেওয়ার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সংক্রান্ত সিপিসি কেন্দ্রীয় কমিটির সিদ্ধান্ত’ গ্রহণ। এই কর্মসূচিভিত্তিক দলিলের নতুনত্ব শুধু ব্যাপক ও কঠোর দলীয় শাসনের ধারণায় নয়; বরং এর ধারাবাহিক ও অবিচল বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার মধ্যেই নিহিত।
‘চীনের বিষয়াদি ভালোভাবে পরিচালনার চাবিকাঠি দলের হাতে, আর দলকে পরিচালনার চাবিকাঠি হলো ব্যাপক ও কঠোর দলীয় শাসন।’ ২০১৪ সালের শুরুতেই সিপিসি কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক সি চিন পিং ব্যাপক ও কঠোর দলীয় শাসনের ধারণা তুলে ধরেন। একে একটি মধ্যম সমৃদ্ধ সমাজ গঠন, সংস্কারকে সার্বিকভাবে গভীরতর করা এবং আইন অনুযায়ী দেশ পরিচালনার পাশাপাশি ‘চার ব্যাপক’ কৌশলগত বিন্যাসের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন।
ব্যাপক ও কঠোর দলীয় শাসন একদিকে পার্টির কঠোর হওয়ার সাহস ও শাসন পরিচালনার সক্ষমতার প্রশ্নের উত্তর দেয়। অন্যদিকে, আত্মবিপ্লবের মাধ্যমে আত্মসমালোচনা ও আমূল সংস্কারের পথ দেখায়। তবে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—একটি দল কীভাবে দীর্ঘ সময় ধরে কঠোর শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং সেই শাসনব্যবস্থা কার্যকর রাখতে পারে? দলীয় শাসনের ধারাবাহিক অগ্রগতির ধারণা এই প্রশ্নেরই জবাব খোঁজে।
‘অবিচল অঙ্গীকারের’ মূল যুক্তি: বড় রাজনৈতিক দলগুলোর বিশেষ সমস্যার সমাধান
দল পরিচালনায় নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নেওয়া বিশেষ অভিযান বা কেন্দ্রীভূত সংশোধনমূলক পদক্ষেপের চেয়ে ‘অবিচলতা’ ভিন্ন। এটি দীর্ঘমেয়াদি শাসনের বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া একটি মৌলিক কৌশলগত উন্নয়ন। দৃঢ় সংকল্প ও ধারাবাহিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে কঠোর সুর, কঠোর পদক্ষেপ এবং কঠোর পরিবেশ বজায় রাখাই এর লক্ষ্য। এর মাধ্যমে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর দীর্ঘদিনের শাসন থেকে উদ্ভূত বিশেষ সমস্যাগুলোর মূল থেকে সমাধান খোঁজা হয়।
‘বড় রাজনৈতিক দলগুলোর বিশেষ সমস্যা’—এটি সি চিন পিংয়ের উত্থাপিত একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। তাঁর মতে, দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা কোনো দলের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কেবল সময়ের সঙ্গে জমে ওঠা সমস্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং আত্মতুষ্টি ও দায়িত্ব পালনে অবহেলার প্রবণতাও বড় ঝুঁকি। একইভাবে, আকস্মিক বা সাময়িক সংকটের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদে চলতে থাকা নানা পরীক্ষা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্বের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের উত্থান-পতনের ইতিহাসেও এ বিষয়ে শিক্ষা রয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টি ৭০ বছরের বেশি সময় ক্ষমতায় ছিল এবং একসময় এর সদস্যসংখ্যা ছিল প্রায় দুই কোটি। কিন্তু শেষ পর্যায়ে দলটির মধ্যে আত্মতুষ্টি বাড়ে, আদর্শ ও বিশ্বাস দুর্বল হয়ে পড়ে, বিশেষ সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর বিস্তার ঘটে এবং জনগণের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত এসব সমস্যা দলটির পতনের অন্যতম কারণ হয়ে ওঠে।
একইভাবে, মেক্সিকোর প্রাতিষ্ঠানিক বিপ্লবী দল টানা ৭১ বছর দেশ শাসন করেছে। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার ফলে দলটির মধ্যে আমলাতান্ত্রিক জড়তা, শাসনব্যবস্থায় শিথিলতা ও দুর্নীতির বিস্তার ঘটে। একপর্যায়ে দলটি জনসমর্থন হারায়।
এ ধরনের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার আলোকে পঞ্চম পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনের সিদ্ধান্তে দীর্ঘমেয়াদি শাসনের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের বাস্তব মূল্যায়ন তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা, সংস্কার ও উন্মুক্তকরণ, বাজার অর্থনীতি এবং পরিবর্তনশীল আন্তর্জাতিক পরিবেশের পরীক্ষা অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে আত্মতুষ্টি, দায়িত্ব পালনে অক্ষমতা, জনগণের কাছ থেকে বিচ্ছিন্নতা ও দুর্নীতির ঝুঁকিও পুরো দলের সামনে রয়েছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দলীয় শৃঙ্খলা আরও জোরদার করতে ধারাবাহিক ও অবিচল প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
অবিচল অঙ্গীকারের’ মূল পদক্ষেপ: তিনটি মৌলিক পরিবর্তন
ব্যাপক ও কঠোর দলীয় শাসন অবিচলভাবে এগিয়ে নেওয়ার মূল বিষয় হলো তিনটি মৌলিক পরিবর্তন। এগুলো নতুন যুগে সিপিসির দল পরিচালনার পদ্ধতিতে গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
প্রথমত, ‘কেন্দ্রীভূত সংশোধন’ থেকে ‘স্বাভাবিক ও দীর্ঘমেয়াদি শাসনব্যবস্থায়’ উত্তরণ। এককালীন প্রচারণাভিত্তিক শাসনের মানসিকতা পরিহার করে বিভিন্ন সমস্যার পুনরাবৃত্তি রোধে কঠোর নিয়মকানুন দৈনন্দিন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা এবং ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। অর্থাৎ, বিশেষ অভিযান-নির্ভরতার পরিবর্তে নিয়মিত ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
দ্বিতীয়ত, ‘সমস্যাভিত্তিক সংশোধন’ থেকে ‘কৌশলগত উদ্যোগে’ উত্তরণ। অতীতে দলীয় শাসনের ক্ষেত্রে কর্মপদ্ধতির ত্রুটি, দুর্নীতি ও অন্যান্য প্রকাশিত সমস্যার লক্ষ্যভিত্তিক সংশোধনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হতো। কিন্তু অবিচল অগ্রগতির ধারণা ঝুঁকি প্রতিরোধ ও ব্যবস্থাপনার একটি সক্রিয় কৌশলগত কাঠামো তৈরি করে। দীর্ঘমেয়াদি শাসনের ফলে সৃষ্ট আমলাতান্ত্রিক জড়তা, জনগণ থেকে বিচ্ছিন্নতা এবং প্রশাসনিক সক্ষমতা হ্রাসের মতো ঝুঁকিগুলো আগেভাগেই শনাক্ত ও মোকাবিলা করাই এর লক্ষ্য। এর ফলে সমস্যা দেখা দেওয়ার আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে এবং দলীয় শাসনের ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে।
তৃতীয়ত, ‘পর্যায়ক্রমিক শাসন’ থেকে ‘দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক কার্যকারিতায়’ উত্তরণ। এর আওতায় দলীয় শাসনব্যবস্থার উন্নয়ন ও পরিমার্জন, অলিখিত নিয়মের অবসান, প্রাতিষ্ঠানিক বাধা দূর করা এবং কঠোর বিধিনিষেধকে বাধ্যতামূলক প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মে রূপান্তরের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি এসব নিয়ম দলের সব সদস্যের আচরণ ও চেতনার অংশ করে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ফলে ব্যাপক ও কঠোর দলীয় শাসন আর সাময়িক প্রচেষ্টা বা বিশেষ অভিযানের ওপর নির্ভরশীল থাকবে না; বরং নিয়মিত পরিচালনা ও কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে এগিয়ে যাবে।
*‘অবিচল অঙ্গীকারের’ পদ্ধতিগত প্রয়োগ: শাসক দলের আত্মগঠনের পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা*
‘অবিচল অঙ্গীকার’ কেবল একটি স্লোগান নয়। ব্যাপক ও কঠোর দলীয় শাসন ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে নেওয়ার কৌশলগত লক্ষ্য বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট ‘সিদ্ধান্ত’-এ একটি পদ্ধতিগত কাঠামো তুলে ধরা হয়েছে।
প্রথমত, ‘দলীয় চেতনা শক্তিশালীকরণ’কে মৌলিক ও সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এর অর্থ হলো, প্রত্যেক দলীয় সদস্যের আদর্শে অবিচল থাকা, দেশের প্রতি অনুগত থাকা এবং জনগণের প্রতি নিবেদিত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করা। পাশাপাশি বাস্তবতা থেকে সত্য অনুসন্ধান, সততা ও ন্যায়পরায়ণতা বজায় রাখা এবং আত্মোন্নয়নকে আজীবনের সাধনা হিসেবে গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, কর্মকর্তাদের কঠোর ব্যবস্থাপনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দলীয় ক্যাডাররা প্রশাসন ও শাসনব্যবস্থার মেরুদণ্ড। তাই ‘সিদ্ধান্তে’ ক্যাডার নির্বাচন, প্রশিক্ষণ, তত্ত্বাবধান ও প্রণোদনার একটি পূর্ণাঙ্গ কাঠামো নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে নিষ্ক্রিয়, অবিশ্বস্ত ও দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের বাদ দেওয়ার পাশাপাশি দায়িত্ব নিতে এবং বাস্তব সাফল্য অর্জনে সাহসী কর্মকর্তাদের সুরক্ষা দেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। অর্থাৎ, কঠোর ব্যবস্থাপনা ও কর্মকর্তাদের প্রতি যথাযথ সহায়তার মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়েছে।
তৃতীয়ত, দলীয় শাসনের পরিধি আরও বিস্তৃত করে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শাসনব্যবস্থা আর কেবল প্রচলিত ক্ষেত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং নতুন অর্থনৈতিক সংগঠন, নতুন সামাজিক সংগঠন এবং নতুন কর্মসংস্থান গোষ্ঠীর মতো উদীয়মান ক্ষেত্রেও এর কার্যক্রম সম্প্রসারিত হবে। এর লক্ষ্য হলো, নতুন সামাজিক কাঠামো ও পরিবর্তনের সঙ্গে দলের শাসনক্ষমতার সমন্বয় ঘটানো এবং উন্নয়নের বিভিন্ন পর্যায়ে কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা।
চতুর্থত, দলীয় চেতনা, দলীয় আচরণ, দলীয় শৃঙ্খলা ও দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমকে সমন্বিত করার কথা বলা হয়েছে। দুর্নীতির তদন্তের পাশাপাশি অসদাচরণ সংশোধনের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ‘দুর্নীতি করার সাহস না করা, দুর্নীতি করার সুযোগ না পাওয়া এবং দুর্নীতি করতে না চাওয়া’—এই তিন দিককে একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে চীনা বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন দুর্নীতিবিরোধী ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
পঞ্চমত, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে দলীয় শাসনের ভিত্তি আরও মজবুত করার কথা বলা হয়েছে। এর ফলে দল পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা আরও বৈজ্ঞানিক, প্রাতিষ্ঠানিক এবং মানসম্মত হয়ে উঠবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
দেশ শাসন করতে হলে প্রথমে দলকে শাসন করতে হবে; আর দলকে শাসন করতে হলে কঠোরভাবে শাসন করতে হবে। ১০৫ বছরের ইতিহাস এবং ১০ কোটিরও বেশি সদস্য নিয়ে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি কীভাবে পরিবর্তনশীল সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তার প্রাণশক্তি বজায় রাখার চেষ্টা করছে? এই প্রশ্নের উত্তরে দলটির নিরলস আত্মগঠন ও আত্মশুদ্ধির প্রচেষ্টার কথা তুলে ধরা হয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে চীনা বৈশিষ্ট্যময় আধুনিকীকরণের দীর্ঘমেয়াদি ও প্রজন্মপরম্পরার যাত্রাকে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্য।
এই অবিচল অঙ্গীকার শতবর্ষী সিপিসির দীর্ঘমেয়াদি শাসনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি কৌশলগত প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নির্ধারিত উন্নয়ন-লক্ষ্য বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও একে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
সূত্র: রুবি-ফয়সল,চায়না মিডিয়া গ্রুপ