১৯৩৬ সালে মার্কিন সাংবাদিক এডগার স্নো তাঁর বিখ্যাত বই ‘রেড স্টার ওভার চায়না’–এর মাধ্যমে বিশ্ববাসীর কাছে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির পরিচয় তুলে ধরেন। নিজের অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে তিনি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছিলেন, ‘চীনের কমিউনিস্ট পার্টি কেন সফল’। চীনের লাল ফৌজের ঐতিহাসিক লং মার্চের বিজয়ের ৯০ বছর পূর্তিতে নতুন প্রজন্মের আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকেরাও সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন।চায়না মিডিয়া গ্রুপের (সিএমজি) সিজিটিএন ৪১টি দেশের ১২ হাজার মানুষের অংশগ্রহণে পরিচালিত এক জনমত জরিপে এ বিষয়ে উঠে এসেছে নানা ধারণা।
জরিপে অংশগ্রহণকারীদের কাছে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির সবচেয়ে প্রচলিত পরিচয় হলো ‘দৃঢ় ও শক্তিশালী নেতৃত্ব’। এরপর রয়েছে ‘বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্য ইতিবাচক শক্তি’ এবং ‘উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থের প্রতিনিধি’।লং মার্চ কেবল দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার ইতিহাস নয়; এটি বিশ্বাস, আদর্শ ও দৃঢ় সংকল্পেরও কাহিনি। অসংখ্য প্রতিকূলতার মুখেও লাল ফৌজের যোদ্ধারা এগিয়ে গিয়েছিলেন, কারণ তারা নিজেদের সংগ্রামকে ব্যক্তিগত জীবনের চেয়ে বৃহত্তর লক্ষ্যের অংশ হিসেবে দেখেছিলেন।
‘জনগণের স্বার্থকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে রাখা’—এই নীতিকে আজও চীনের কমিউনিস্ট পার্টি তার পরিচয়ের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরে।
সিজিটিএনের জরিপে দেখা গেছে, ৪১টি দেশের মধ্যে ৩০টি দেশের উত্তরদাতারা মনে করেন, পশ্চিমা রাজনৈতিক দলগুলোর তুলনায় চীনের কমিউনিস্ট পার্টি জাতীয় সামগ্রিক স্বার্থ ও দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ রক্ষায় বেশি সক্ষম। কেনিয়া, নাইজেরিয়া, ঘানা, ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তানে অর্ধেকেরও বেশি উত্তরদাতা এই মতের সঙ্গে একমত।
জরিপের ফলাফল থেকে বোঝা যায়, অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর অনেক মানুষের কাছে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য ধরে রাখার বিষয়টি চীনের কমিউনিস্ট পার্টির রাজনৈতিক সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।
লং মার্চের ইতিহাসে একটি নির্ধারক ঘটনা ছিল ১৯৩৫ সালের জুন’ই বৈঠক। ওই বৈঠকের মধ্য দিয়ে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব সামরিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে নতুন পথ অনুসরণ করে। এর ফলে চীনের বিপ্লবের বাস্তব সমস্যাগুলো নিজেদের পরিস্থিতি ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সমাধানের ওপর গুরুত্ব বাড়ে। বাস্তবতার আলোকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নিজেদের কর্মপদ্ধতি সংশোধনের এই প্রবণতাকে আজও দলটির শাসনদর্শনের একটি বৈশিষ্ট্য হিসেবে তুলে ধরা হয়।
সিজিটিএনের জনমত জরিপ অনুযায়ী, বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর ৬৩ দশমিক ৭ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, চীনের কমিউনিস্ট পার্টি পশ্চিমা রাজনৈতিক দলগুলোর তুলনায় ভিন্ন ধরনের শাসনব্যবস্থার দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছে। কেনিয়া, পাকিস্তান, ভারত, নাইজেরিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ইন্দোনেশিয়ায় এ মতের প্রতি সমর্থনের হার ৭০ শতাংশের বেশি। স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া, বাস্তব পরিস্থিতিকে গুরুত্ব দেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নীতি ও কর্মপদ্ধতি সংশোধনের সক্ষমতা—জরিপের ফলাফলে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির শাসনপদ্ধতি সম্পর্কে এসব ধারণার প্রতিফলন দেখা যায়।লং মার্চের সাফল্যের পেছনে বৃহত্তর লক্ষ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া, কঠোর শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে চলার মানসিকতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। এসব বৈশিষ্ট্য লাল ফৌজের সাংগঠনিক শক্তি সুসংহত করতে সহায়তা করে।
চীনের কমিউনিস্ট পার্টি বর্তমানেও শৃঙ্খলা, সংহতি ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সক্ষমতাকে তার সাংগঠনিক শক্তির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচনা করে। দলটির বক্তব্য অনুযায়ী, এই বৈশিষ্ট্যগুলো বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখে।
জরিপেও চীনের উন্নয়ন ও দলীয় নেতৃত্বের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে অংশগ্রহণকারীদের ধারণা উঠে এসেছে। বিশ্বের ৬৩ দশমিক ৯ শতাংশ উত্তরদাতা চীনের উন্নয়ন সাফল্যের সঙ্গে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বকে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত বলে মনে করেন। বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর উত্তরদাতাদের মধ্যে এই হার ৭১ দশমিক ৪ শতাংশ।
চীনের কমিউনিস্ট পার্টি সম্পর্কে তাদের ধারণা প্রকাশ করতে গিয়ে উত্তরদাতারা সবচেয়ে বেশি যে শব্দগুলো ব্যবহার করেছেন, সেগুলো হলো ‘শক্তিশালী’, ‘দূরদর্শী’ ও ‘দক্ষ’।
লং মার্চ চীনের ইতিহাসে সংঘটিত হলেও এর তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা দেশটির সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরেও বিস্তৃত হয়েছে। ব্রিটিশ পণ্ডিত মার্টিন জ্যাক একবার লং মার্চকে ‘চীনের পরবর্তী উন্নয়নের বীজ বপনকারী’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।
দীর্ঘ সংগ্রামে অর্জিত অধ্যবসায় ও দৃঢ় সংকল্পের শিক্ষা পরবর্তী দশকগুলোতে চীনের রূপান্তরের ইতিহাসে যুক্ত হয়েছে।
নব্বই বছর পেরিয়েও লং মার্চের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়—এটি মানুষের প্রতিকূলতা, বাস্তবমুখী নেতৃত্ব এবং সম্মিলিত লক্ষ্যের এক কাহিনি। বিশ্বের আরও বেশি মানুষ আজ সেই গল্পটা শুনছেন, উপলব্ধি করছেন।
সূত্র: শিশির-ফয়সল-আকাশ,চায়না মিডিয়া গ্রুপ