আন্তর্জাতিক: মঙ্গলবার, ১৯ আগস্ট চীনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় শায়ানসি প্রদেশের রাজধানী সি’আনে বাংলাদেশি সাংবাদিকদের ১০ দিনের সফরের প্রথম দিনের কার্যক্রম শুরু হয়। চীন সরকারের আমন্ত্রণে এবং চায়না মিডিয়া গ্রুপের (সিএমজি) তত্ত্বাবধানে ‘রোমিং চায়না, শায়ানসি ট্যুর’-এর অংশ হিসেবে এই সফরে এসেছেন বাংলাদেশের বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় সাংবাদিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
দলের সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি ও কবি হাসান হাফিজ, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির মহাসচিব মো. মাইনুল হাসান, বাংলাদেশ স্পোর্টস প্রেস অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট রিজওয়ান উজ জামান, বাংলাদেশ ফটোজার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব বাবুল তালুকদার, ফোরাম ফর এনার্জি রিপোর্টার্স বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আজিজুর রহমান, অনলাইন এডিটর্স অ্যালায়েন্সের অর্থ সচিব মাইন উদ্দিন বকুল, টেকনোলজি মিডিয়া গিল্ড বাংলাদেশের ভাইস প্রেসিডেন্ট কাইয়ুম হাসান রিশাদসহ আরও কয়েকজন সাংবাদিক।
বৌদ্ধ ঐতিহ্যের সাক্ষী তা ইয়ান থান
সি’আনে সফরের শুরুতেই সাংবাদিক দলটি যায় তা ইয়ান থান বা তা ছি এন মন্দিরে। থাং রাজবংশের আমলে ৬৫২ খ্রিস্টাব্দে মহান সন্ন্যাসী সুয়ান চাংয়ের নেতৃত্বে এই স্থাপনা নির্মিত হয়।
ভারত থেকে নিয়ে আসা বৌদ্ধ ধর্মের নানা গ্রন্থ, মূর্তি ও ধর্মীয় সামগ্রী সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে এটি নির্মাণ করা হয়েছিল। এখানকার প্রাচীন প্যাগোডা চীনের থাং যুগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।
মন্দিরের প্রাচীন স্থাপত্য আর শান্ত পরিবেশ সাংবাদিকদের মনে গভীর ছাপ ফেলে। বিশেষ করে ভারত থেকে চীনে বৌদ্ধ ধর্মীয় জ্ঞান ও সংস্কৃতি নিয়ে যাওয়ার ইতিহাস তাদের কাছে হয়ে ওঠে আরও আকর্ষণীয়। ইতিহাসের সেই পথচলায় বাংলাদেশের সঙ্গেও কোনো না কোনোভাবে যোগাযোগের সম্ভাবনার কথা উঠে আসে সফরকারীদের আলোচনায়।
মাটির নিচে হাজার বছরের ইতিহাস
বিকেলে দলটি পৌঁছায় চীনের অন্যতম বিখ্যাত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ছিন সম্রাটের টেরাকোটা আর্মিতে।
১৯৭৪ সালে স্থানীয় কৃষকেরা ঘটনাক্রমে মাটির নিচে পোড়ামাটির সৈন্যদের সন্ধান পান। এরপর খননকাজে বেরিয়ে আসে হাজার হাজার সৈন্য ও ঘোড়ার মূর্তি। প্রতিটি মূর্তির মুখাবয়ব, পোশাক ও শারীরিক গঠনে রয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্য।
ছিন শি হুয়াংয়ের সমাধিকে কেন্দ্র করে তৈরি এই বিশাল টেরাকোটা বাহিনী আজ চীনের প্রাচীন সভ্যতার অন্যতম প্রতীক। ১৯৮৭ সালে এটি ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পায়। মাটির নিচে সারি সারি সৈন্যের বিশাল বাহিনী দেখে বিস্মিত হন বাংলাদেশি সাংবাদিকরা।
ফোরাম ফর এনার্জি রিপোর্টার্স বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আজিজুর রহমান বলেন, “টেরাকোটায় যা দেখেছি তা অবিস্মরণীয়। চীনের ইতিহাস যে এত পুরনো এবং তাদের এমন সমৃদ্ধ অতীত রয়েছে, তা নিজের চোখে দেখলাম।”
তিনি আরও বলেন, প্রকৃতি ও প্রযুক্তির সমন্বয়ে রাতে যে পরিবেশনা দেখেছেন, সেটিও তার কাছে ছিল অসাধারণ অভিজ্ঞতা।
বাংলাদেশ স্পোর্টস প্রেস অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট রিজওয়ান উজ জামানের কাছেও টেরাকোটা আর্মির অভিজ্ঞতা ছিল অবিশ্বাস্য।
তার ভাষায়, মাটির নিচে হাজার হাজার মানুষের আকৃতির মূর্তি দেখে নিজের চোখকে বিশ্বাস করাই কঠিন। তিনি মনে করেন, সুযোগ পেলেই বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের চীনের এই ইতিহাস দেখতে আসা উচিত।
প্রকৃতির মঞ্চে ইতিহাসের গল্প
দিনের শেষ আয়োজন ছিল আরও অন্যরকম। রাতে হুয়াছিং প্রাসাদে সাংবাদিকরা উপভোগ করেন ‘ছাং হেন গে’ ল্যান্ডস্কেপ লাইভ শো।
প্রকৃতি, আলো, সংগীত, নৃত্য ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে তৈরি এই পরিবেশনা চীনের ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে নতুনভাবে তুলে ধরে। থাং সম্রাট সুয়ান চং ও তার প্রিয় রাজকীয় উপপত্নী ইয়াং ইয়ু হুয়ানের প্রেমকাহিনি ঘিরে তৈরি এই আয়োজন কবি পাই চু ই’র বিখ্যাত কবিতার ওপর ভিত্তি করে নির্মিত।
প্রকৃতিকে মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করে এত বড় পরিসরে ইতিহাসকে উপস্থাপন দেখে মুগ্ধ হন সফরকারীরা।
অনলাইন এডিটর্স অ্যালায়েন্সের অর্থ সচিব মাইন উদ্দিন বকুল বলেন, “রাতের অপেরা দেখে আমি মুগ্ধ। এমন শো পৃথিবীর যেকোনো মানুষ দেখলে বিমোহিত হবে।”
টেকনোলজি মিডিয়া গিল্ড বাংলাদেশের ভাইস প্রেসিডেন্ট কাইয়ুম হাসান রিশাদও জানান নিজের বিস্ময়ের কথা। তার মতে, প্রকৃতি ও প্রযুক্তিকে একসঙ্গে ব্যবহার করে এমন অসাধারণ পরিবেশনা আগে দেখেননি তিনি।
ইতিহাসের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগসূত্র
সি’আনের এই সফরে শুধু চীনের ইতিহাসই নয়, বাংলাদেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গেও নানা যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছেন সাংবাদিকরা।
মহান সন্ন্যাসী সুয়ান চাংয়ের ভারত ভ্রমণের প্রসঙ্গ টেনে রিজওয়ান উজ জামান বলেন, তার ধর্মীয় জ্ঞান ও ভ্রমণের ইতিহাসের সঙ্গে বাংলাদেশেরও একটি যোগসূত্র রয়েছে বলে জানা যায়। ফলে প্রাচীন চীনের এই ইতিহাস দেখতে গিয়ে বাংলাদেশের কথাও মনে পড়েছে তার।
কাইয়ুম হাসান রিশাদও বলেন, চীনে বৌদ্ধ ধর্মের বিস্তার এবং প্রাচীনকাল থেকে বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে জ্ঞান ও সংস্কৃতির আদান-প্রদানের ইতিহাস এই সফরের মাধ্যমে নতুনভাবে উপলব্ধি করেছেন।
এক শহরে অতীত ও বর্তমান
সি’আনের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ সম্ভবত এখানেই—এখানে ইতিহাস কেবল জাদুঘরের কাচের ভেতরে বন্দি নয়। প্রাচীন স্থাপনা, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও হাজার বছরের সংস্কৃতির পাশাপাশি আধুনিক নগরজীবনও সমান গতিতে এগিয়ে চলছে।
একদিকে থাং যুগের প্যাগোডা, অন্যদিকে হাজার বছরের পুরোনো টেরাকোটা সৈন্যবাহিনী; আবার রাত নামলেই আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় প্রকৃতির বুকে জীবন্ত হয়ে ওঠে প্রাচীন প্রেমের গল্প।
এই বৈপরীত্যই সি’আনকে করেছে অনন্য। সাংবাদিকদের চোখে, সি’আন যেন এমন এক শহর, যেখানে অতীতকে সংরক্ষণ করেই ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার গল্প লেখা হচ্ছে।
সি’আন থেকে শায়ানসির বৃহত্তর গল্প
সি’আন সফরের পর বাংলাদেশি সাংবাদিকদের সামনে শায়ানসি প্রদেশের আরও বিস্তৃত চিত্র তুলে ধরার সুযোগ রয়েছে। চীনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের এই প্রদেশ শুধু ইতিহাস ও সংস্কৃতির জন্যই নয়, পরিবেশ সংরক্ষণ, গ্রামীণ পুনরুজ্জীবন, বিশেষায়িত শিল্প এবং ডিজিটাল অর্থনীতির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
এই সফরের মাধ্যমে সাংবাদিকরা চীনের উন্নয়নের নানা দিক সরাসরি দেখার পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও সংস্কৃতির আদান-প্রদানের সুযোগ পাচ্ছেন।
‘রোমিং চায়না, শায়ানসি ট্যুর’-এর এই যাত্রা তাই শুধু একটি ভ্রমণ নয়; এটি ইতিহাসকে কাছ থেকে দেখা, সংস্কৃতিকে অনুভব করা এবং আধুনিক চীনের পরিবর্তনের গল্পকে নতুনভাবে জানার এক অভিজ্ঞতা।
সি’আনের প্রাচীন প্যাগোডা থেকে টেরাকোটা আর্মি, আর সেখান থেকে প্রকৃতির মঞ্চে আলোর ঝলকে জীবন্ত হয়ে ওঠা ইতিহাস এক দিনের এই যাত্রাতেই যেন কয়েক হাজার বছরের চীনকে একসঙ্গে দেখে ফেললেন বাংলাদেশের সাংবাদিকরা।
সূত্র: সাকিব-নাহার,চায়না মিডিয়া গ্রুপ।