আন্তর্জাতিক: প্রতি বছরের জুন মাসের তৃতীয় রোববার বিশ্বজুড়ে পালিত হয় ফাদার্স ডে বা বাবা দিবস। এই দিনে মানুষ তাদের বাবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন কিংবা পরিবারের সঙ্গে কাটানো স্মৃতিগুলো স্মরণ করেন।
চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং পরিবার শিক্ষা ও পারিবারিক মূল্যবোধের গুরুত্বের ওপর বারবার গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি মনে করেন, একটি শক্তিশালী সমাজ গঠনে পরিবারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সি চিন পিংয়ের জীবন দর্শন এবং দেশের জনগণের প্রতি তার অবিচল অঙ্গীকারের পেছনে গভীর প্রভাব রয়েছে তার বাবা সি চোংসুনের (১৯১১-২০০২)। বাবার কাছ থেকে পাওয়া সততা, কঠোর পরিশ্রম এবং সাধারণ মানুষের প্রতি ভালোবাসা—এই মহৎ গুণগুলোই সি চিন পিংকে একজন প্রকৃত জনসেবক হিসেবে গড়ে তুলেছে।
আজ থেকে দুই দশকেরও বেশি সময় আগে, তৎকালীন ফুচিয়ান প্রদেশের গভর্নর থাকাকালীন সি চিন পিং তার বাবা—যিনি ছিলেন একজন আজীবন বিপ্লবী—তাকে লেখা এক চিঠিতে উল্লেখ করেছিলেন, "বাবার এমন অনেক মহৎ গুণ রয়েছে, যা আমি নিজের জীবনে ধারণ করতে চাই।" বাবার সেই আদর্শ ও শিক্ষা পরবর্তী সময়ে সি চিনপিংয়ের রাজনৈতিক জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।
`জনগণের পাশে সোজা হয়ে দাঁড়াও`
১৯৬৯ সালের জানুয়ারি মাসে, মাত্র ১৬ বছর বয়সে সি চিনপিং উত্তর-পশ্চিম চীনের শায়ানসি প্রদেশের এক প্রত্যন্ত গ্রাম লিয়াংচিয়াহ্য-তে যান। সেখানে তিনি স্থানীয় কৃষকদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মাঠে কাজ করেন। সেই কঠিন দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করে পরবর্তীতে এক আত্মজীবনীমূলক লেখায় সি চিন পিং লিখেছিলেন, "জনগণের একজন সেবক হিসেবে উত্তর শায়ানসি মালভূমিতেই আমার শিকড় পোতা রয়েছে। কারণ, এই মাটিই আমার ভেতরের চিরন্তন মিশনটি তৈরি করে দিয়েছে: জনগণের জন্য বাস্তব কিছু করা।"
উত্তর-পশ্চিম চীনের সুইত্য কাউন্টির সাবেক পার্টি কমিটির কার্যালয়ে একটি উক্তি বিশেষভাবে নজর কাড়ে, যেখানে লেখা রয়েছে—"জনগণের পাশে সোজা হয়ে দাঁড়াও"। উক্তিটি ছিল সি চিন পিংয়ের বাবা সি চোংসুনের, যিনি একসময় সুইত্য কাউন্টির পার্টি প্রধান ছিলেন।
বাবার এই দর্শনকে বুকে ধারণ করেই সি চিনপিং তার দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে লিয়াংচিয়াহ্য থেকে চেংতিং, ফুচিয়ান থেকে চেচিয়াং এবং শাংহাই থেকে বেইজিং—সর্বত্রই কমিউনিস্ট পার্টির মূল নীতি ‘জনগণের সেবা করা’কে সবার ওপরে স্থান দিয়েছেন।
মাঠপর্যায়ের গবেষণা ও সমাধানমুখী নেতৃত্ব
বাবার মতোই সি চিনপিং সবসময় মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র বুঝতে এবং সমস্যার মূল কারণ খুঁজে বের করতে নিবিড় অনুসন্ধান ও গবেষণার ওপর জোর দিয়েছেন।
১৯৭৮ সালের আগস্ট মাসে, যখন তিনি সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, তখন তিনি তার বাবা (তৎকালীন কুয়াংতুং প্রদেশের পার্টি প্রধান)-এর সাথে গ্রামীণ এলাকা পরিদর্শনে যান। সেখান থেকেই তিনি শেখেন যে, যে কোনো সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে হলে জনগণের খুব কাছাকাছি যেতে হবে।
এই ধারাবাহিকতায় তিনি হ্যপেই প্রদেশের চেংতিংয়ের প্রতিটি গ্রাম এবং ফুচিয়ানের নিংত্যের প্রায় সব জনপদে নিজে গিয়ে মানুষের খোঁজ নিয়েছেন। চেচিয়াং প্রদেশে বদলি হওয়ার পর মাত্র এক বছরের কিছু বেশি সময়ে তিনি সেখানকার ৯০টি কাউন্টি পরিদর্শন করেন।
এমনকি নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রেও তিনি এই ধারা বজায় রেখেছেন। ২০২৬-২০৩০ সালের জন্য চীনের ‘১৫তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা’ প্রণয়নের ক্ষেত্রেও তিনি শীর্ষ পর্যায়ের পরিকল্পনার সাথে সাধারণ মানুষের পরামর্শের সমন্বয় ঘটানোর ওপর বিশেষ তাগিদ দিয়েছেন।
সততা ও মিতব্যয়িতার পারিবারিক ঐতিহ্য
সি চিনপিংয়ের পরিবারে মিতব্যয়িতা ও কঠোর শৃঙ্খলা ছিল অত্যন্ত স্বাভাবিক বিষয়। ২০০১ সালে বাবার ৮৮তম জন্মদিনে লেখা চিঠিতে সি চিন পিং উল্লেখ করেছিলেন, "বাবা অত্যন্ত সাদামাটা জীবনযাপন করেন। আপনার কঠোর অভিভাবকত্ব সর্বজনবিদিত। বাবার শিক্ষা ও প্রভাবেই আমরা ছোটবেলা থেকেই কঠোর পরিশ্রম ও মিতব্যয়িতার অভ্যাস গড়ে তুলেছি।"
২০১৮ সালে জাতীয় গণ-কংগ্রেসের বার্ষিক অধিবেশনেও সি চিন পিং বলেছিলেন, "এখনও আমার বাড়িতে ভাতের থালার একটি দানাও নষ্ট করার নিয়ম নেই। পরিশ্রম এবং মিতব্যয়িতার এই অভ্যাস ধরে রাখা উচিত।"
নেতৃত্বের উচ্চপর্যায়ে থেকেও পারিবারিক মূল্যবোধকে সবসময় অগ্রাধিকার দেন সি চিনপিং। ২০১৬ সালের এক সম্মেলনে তিনি উল্লেখ করেছিলেন, "পারিবারিক শিক্ষার অনেক দিক থাকতে পারে, তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে এটি হলো একজন ভালো মানুষ হওয়া শেখানো।"
সি চোংসুন একবার বলেছিলেন, "কমিউনিস্ট পার্টির একজন সদস্যের জন্য পার্টির হয়ে মানুষের জন্য কাজ করার চেয়ে বড় আনন্দ এবং গর্বের আর কী হতে পারে!" বাবার সেই কথা ও কাজকে পাথেয় করেই সি চিনপিং আজীবন নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন চীনের জনগণের ভাগ্যোন্নয়নের কাজে।
সূত্র:সিএমজি বাংলা।