মঙ্গলবার, নভেম্বর ৩, ২০২৬
  
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
শিরোনাম :

   আন্তর্জাতিক
জাতীয় পুনরুজ্জীবনে দক্ষ মানবসম্পদ গঠন: সি চিন পিংয়ের দল গঠন দর্শনের মূল ভিত্তি
  Date : 02-11-2026
Share Button

সুশাসনের অন্যতম চাবিকাঠি হলো যোগ্য ও উপযুক্ত ব্যক্তিকে বেছে নেওয়া। সেই সূত্রে দেশ পরিচালনাতেও এর গুরুত্ব অনেক। জাতীয় পুনরুজ্জীবনের গুরুদায়িত্ব পালনে সক্ষম উচ্চমানের ক্যাডার দল গড়ে তোলা চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের দল গঠনবিষয়ক চিন্তাধারার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ লক্ষ্য অর্জনে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিসি) আনুগত্য, সততা ও দায়িত্ববোধকে ক্যাডার নির্বাচনের তিনটি মৌলিক মানদণ্ড হিসেবে নির্ধারণ করেছে।

ক্যাডার বাছাই, প্রশিক্ষণ, নিয়োগ ও ব্যবস্থাপনার প্রতিটি পর্যায়ে এসব নীতি অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। নতুন যুগে যোগ্য নেতৃত্ব নির্বাচন এবং শক্তিশালী নেতৃত্ব কাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এই মানদণ্ডগুলো সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিচ্ছে।

কর্মী বাছাই ও নিয়োগের এই সমন্বিত মানদণ্ড একেবারে নতুন কোনো ধারণা নয়। এর শিকড় রয়েছে চীনের ঐতিহ্যবাহী সুশাসন-চিন্তায়। কেননা, চীনা সমাজে দীর্ঘকাল ধরে সৎ, যোগ্য ও জনকল্যাণে নিবেদিত ব্যক্তিদের নেতৃত্বে আনার ধারণা গুরুত্ব পেয়ে আসছে। নতুন যুগের ক্যাডারদের জন্য নির্ধারিত ‘আনুগত্য, সততা ও দায়িত্ববোধ’-এর মানদণ্ডে সেই ঐতিহ্যের প্রতিফলন রয়েছে। একই সঙ্গে এতে মেধার ভিত্তিতে যোগ্য ব্যক্তি নির্বাচনের প্রাচীন ধারণার সঙ্গে সমসাময়িক দল গঠনের প্রয়োজনীয়তারও সমন্বয় ঘটেছে।

এই তিন মানদণ্ড পরস্পরের পরিপূরক। আনুগত্য বলতে বোঝায় অবিচল আদর্শিক বিশ্বাস ও বিশুদ্ধ উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করা। জনগণের সুখ এবং জাতির পুনরুজ্জীবনের লক্ষ্যে সিপিসির আদর্শ ও নীতির প্রতি অবিচল থাকা, দৃঢ় রাজনৈতিক অবস্থান বজায় রাখা এবং দ্বিমুখী আচরণ থেকে বিরত থাকা এর অন্তর্ভুক্ত। একই সঙ্গে দলের ও জনগণের মৌলিক স্বার্থকে সব সময় অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।

সততা হলো ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে জনস্বার্থকে স্থান দেওয়া। এর অর্থ দলের শৃঙ্খলা ও নিয়মকানুন কঠোরভাবে মেনে চলা, প্রলোভন প্রতিরোধ করা, পক্ষপাতিত্ব থেকে দূরে থাকা এবং দায়িত্ব পালনে নিরপেক্ষ থাকা। সরকারি ক্ষমতা ব্যবহারে স্বচ্ছতা ও নৈতিকতা নিশ্চিত করাও এই মানদণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

অন্যদিকে, দায়িত্ববোধ বলতে বোঝায় নিষ্ঠা, অধ্যবসায় ও বাস্তবসম্মত মনোভাব নিয়ে দায়িত্ব পালন করা। বাধা, মানুষের জীবন-জীবিকার সংকট কিংবা কঠিন পরিস্থিতির মুখে দায়িত্ব এড়িয়ে না গিয়ে সাহসের সঙ্গে সমস্যার মোকাবিলা করা এর মূল কথা। জনগণের জরুরি প্রয়োজন ও উদ্বেগের সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এবং উন্নয়নের লক্ষ্য বাস্তবায়নে উদ্যোগী হওয়াও দায়িত্ববোধের পরিচয়।

এই তিনটি গুণ একে অপরকে শক্তিশালী করে এবং একই সঙ্গে একটির অভাব অন্য দুটির কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে পারে। আনুগত্য না থাকলে দায়িত্ববোধ স্থানীয় বা ব্যক্তিস্বার্থের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। সততা না থাকলে দায়িত্ব পালনের নামে ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়। আবার আনুগত্য ও সততার কথা বললেও দায়িত্ব পালনে উদ্যোগী না হলে তা নিষ্ক্রিয়তারই নামান্তর।

তাই সিপিসির কর্মী নির্বাচনের মানদণ্ডে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—আনুগত্যের ঘাটতি থাকলে শুধু দক্ষতা দিয়ে সেই ঘাটতি পূরণ করা যায় না; সততায় গুরুতর ঘাটতি থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়া যায় না; আর নিয়ম মেনে চললেও যাদের কার্যকরভাবে কাজ করার সক্ষমতা নেই, তারা রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুদায়িত্ব পালনে উপযুক্ত নন।

একটি অভিন্ন ও কঠোর মানদণ্ড প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি প্রতিভা শনাক্ত ও বিকাশের পদ্ধতিতেও পরিবর্তন এনেছে সিপিসি। প্রচলিত পরিচিতি বা ব্যক্তিগত সুপারিশের ভিত্তিতে প্রতিভা বাছাইয়ের পরিবর্তে বাস্তব কর্মক্ষেত্রে দক্ষতা ও সক্ষমতা যাচাইয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

এ পদ্ধতিকে বলা হচ্ছে ‘রেসের ট্র্যাক থেকে সেরা ঘোড়া বেছে নেওয়া’। সিপিসির অষ্টাদশ জাতীয় কংগ্রেসের পর থেকে নতুন যুগে দলের সাংগঠনিক নীতির আলোকে এই ধারণা ক্যাডার নির্বাচনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নীতিতে পরিণত হয়েছে।

তৃণমূল পর্যায়, গ্রামীণ পুনরুজ্জীবন কর্মসূচি এবং চ্যালেঞ্জ ও ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্বপূর্ণ পদগুলোকে ক্যাডারদের সক্ষমতা যাচাইয়ের ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এসব জায়গায় বাস্তব অভিজ্ঞতা ও কাজের ফলাফলের ভিত্তিতে তাদের দক্ষতা ও নেতৃত্বের গুণাবলি মূল্যায়ন করা হয়। ধীরে ধীরে এই পদ্ধতি একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও মানসম্মত কর্মী নিয়োগ ব্যবস্থার রূপ নিয়েছে।

দারিদ্র্যবিমোচন অভিযান এই কর্মী নির্বাচন ও মূল্যায়নব্যবস্থার একটি উল্লেখযোগ্য বাস্তব উদাহরণ। প্রত্যন্ত অঞ্চলে কাজ করা হাজার হাজার তৃণমূল কর্মী জনগণের সেবা এবং দারিদ্র্য দূর করার লক্ষ্যে নিষ্ঠা ও অধ্যবসায়ের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাদের কাজের মধ্য দিয়ে দলের আদর্শ এবং ‘জনগণের জন্য সবকিছু’—এই নীতির প্রতি আনুগত্যের প্রতিফলন ঘটেছে। একই সঙ্গে তারা শৃঙ্খলা মেনে সহায়তার প্রতিটি সম্পদ যথাযথভাবে ব্যবহারের চেষ্টা করেছেন এবং দায়িত্ব পালনে সততা ও নিষ্ঠা বজায় রেখেছেন।

দারিদ্র্যের দীর্ঘদিনের সমস্যা মোকাবিলা, গ্রামীণ শিল্পের বিকাশ এবং মানুষের জীবনযাত্রার ঘাটতি পূরণে তারা কাজ করেছেন। নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করে স্থানীয় জনগণকে আয় বাড়াতে ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যেতে সহায়তা করেছেন। এভাবে তৃণমূল পর্যায়ের কাজের মধ্য দিয়ে অনেক ক্যাডার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন এবং জাতীয় পুনরুজ্জীবনের দায়িত্ব পালনে সক্ষম নেতৃত্ব হিসেবে গড়ে উঠেছেন।

যোগ্য ক্যাডার দল গঠনের পাশাপাশি সিপিসি প্রতিভার মাধ্যমে দেশকে শক্তিশালী করার কৌশলও এগিয়ে নিচ্ছে। এ লক্ষ্যে প্রতিভা বিকাশের নীতি ও পদ্ধতিতে সংস্কার জোরদার করা হচ্ছে, বিভিন্ন খাত ও পেশার মধ্যকার বাধা কমানো হচ্ছে এবং বিজ্ঞানী, দক্ষ কারিগর, স্থানীয় পর্যায়ের প্রতিভাবান ব্যক্তি ও অন্যান্য যোগ্য পেশাজীবীদের কাজে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। দেশপ্রেম ও উদ্ভাবনী মনোভাবসম্পন্ন প্রতিভাবান মানুষ গড়ে তোলার পাশাপাশি চীনা বৈশিষ্ট্যময় আধুনিকীকরণের লক্ষ্য বাস্তবায়নে দেশজুড়ে মেধা ও দক্ষতাকে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

কর্মী নির্বাচন ও নিয়োগের ক্ষেত্রে আনুগত্য, সততা এবং দায়িত্ববোধের মানদণ্ড কেবল চীনা বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন একটি ক্যাডার ও প্রতিভা বিকাশ ব্যবস্থাই তৈরি করেনি, বরং বিশ্বজুড়ে শাসক দলগুলোর জন্য একটি সমাধানও দিয়েছে। যেখানে অনেক দেশ স্বল্পমেয়াদি দলীয় সংগ্রাম ও রাজনৈতিক অন্তর্দ্বন্দ্বে নিমজ্জিত, সেখানে চীন ধারাবাহিকভাবে একটি দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন শক্তিশালী শাসক দল গঠন করেছে, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ক্যাডারদের সাহসী, সক্ষম ও দক্ষ করে তুলেছে এবং জাতীয় পুনরুজ্জীবনের ঐতিহাসিক দায়িত্ব দৃঢ়ভাবে কাঁধে তুলে নিতে সাহায্য করেছে।

আনুগত্য, সততা ও দায়িত্ববোধ—এই তিন মানদণ্ডের ভিত্তিতে যোগ্য ব্যক্তিদের শনাক্ত করা, বাস্তব কর্মক্ষেত্রে তাদের দক্ষতা যাচাই এবং বিভিন্ন ক্ষেত্র থেকে প্রতিভাবানদের কাজে যুক্ত করার মধ্য দিয়ে চীন একটি ধারাবাহিক ক্যাডার ও প্রতিভা বিকাশব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। ঐতিহ্যবাহী চীনা মূল্যবোধ ও সমসাময়িক শাসনব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই পদ্ধতিকে বলা যায় দেশটির আধুনিকীকরণ ও জাতীয় পুনরুজ্জীবনের লক্ষ্য বাস্তবায়নে মানবসম্পদের ভিত্তি শক্তিশালী করার একটি প্রচেষ্টা।

সূত্র: রুবি-ফয়সল-লাবণ্য,চায়না মিডিয়া গ্রুপ



  
  সর্বশেষ
ঐতিহাসিক উত্থান-পতনের চক্র অতিক্রম করতে মাও সে তুং থেকে সি চিন পিংয়ের পথনির্দেশনা
চেংচৌতে হুয়াংহো নদী সংরক্ষণ সম্মেলন: সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার সুফল তুলে ধরলেন সি চিন পিং
জাতীয় পুনরুজ্জীবনে দক্ষ মানবসম্পদ গঠন: সি চিন পিংয়ের দল গঠন দর্শনের মূল ভিত্তি
বেইজিংয়ে ওমানের সুলতান হাইথাম বিন তারিকের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের ফলপ্রসূ বৈঠক

প্রকাশক ও সম্পাদক : ফাতেমা ইসলাম তানিয়া
সম্পাদক কর্তৃক বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস ২১৯ ফকিরেরপুল ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত ।
২১৯ ফকিরেরপুল (১ম গলি ২য় তলা), মতিঝিল ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত । মোবাইল : ০১৮৩৪-৮৯৮৫০৪ ই-মেইল :
E-mail : alordiganto2021@gmail.com