| আন্তর্জাতিক, অক্টোবর ৩ : নোবেল পুরস্কারজয়ী পদার্থবিদ কনস্টান্টিন নোভোসেলভ সম্প্রতি বেইজিংয়ে চায়না মিডিয়া গ্রুপকে (সিএমজি) দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে গ্রাফিন প্রযুক্তির সর্বশেষ অগ্রগতি, চীনের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভূমিকা এবং আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সহযোগিতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর মতামত তুলে ধরেন। ২০১০ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পাওয়া কনস্টান্টিন নোভোসেলভ গ্রাফাইট থেকে গ্রাফিন আলাদা করার যুগান্তকারী গবেষণার জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। তিনি বলেন, গ্রাফিন প্রযুক্তি বর্তমানে ‘দ্বিতীয় বিপ্লব’-এর পর্যায়ে প্রবেশ করছে। প্রচলিত ক্ষেত্রে গ্রাফিনের ব্যবহার মূলত জ্বালানি, ইলেকট্রনিকস ও কম্পোজিট উপকরণে সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন আলোক-ইলেকট্রনিকস ও দূরপাল্লার যোগাযোগ প্রযুক্তিতে এর প্রয়োগ আরও বিস্তৃত হচ্ছে। একই সঙ্গে জীববিজ্ঞান ও চিকিৎসাক্ষেত্রেও গ্রাফিনের গবেষণা দ্রুত এগোচ্ছে। চীনে গ্রাফিনের শিল্পায়ন প্রসঙ্গে কনস্টান্টিন নোভোসেলভ বলেন, চীনের বড় সুবিধাগুলোর মধ্যে রয়েছে কাঁচামাল সরবরাহের সক্ষমতা এবং বিপুলসংখ্যক দক্ষ জনশক্তি। চীনে গ্রাফিন প্রযুক্তির বিকাশ তুলনামূলকভাবে সহজ হওয়ার অন্যতম কারণ হলো দেশটির ধারাবাহিক ও পূর্ণাঙ্গ সরবরাহব্যবস্থা। তাঁর মতে, নতুন কোনো উপকরণ নিজে থেকেই সম্পূর্ণ সমাধান নয়; সেটিকে কোনো না কোনোভাবে সরবরাহশৃঙ্খলের সঙ্গে যুক্ত হতে হয়, আর চীন ইতোমধ্যেই এই সংযোগ গড়ে তুলেছে। চীনের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়ন প্রসঙ্গে নোভোসেলভ বলেন, চীনের উন্নয়নের গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছিল দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ পাঁচসালা পরিকল্পনার সময়। বিশেষ করে ত্রয়োদশ পাঁচসালা পরিকল্পনায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ওপর দেওয়া গুরুত্ব ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। চীনা গবেষকদের সঙ্গে বহু বছর ধরে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন, এসব নীতির বাস্তবায়ন কীভাবে বাস্তব প্রযুক্তিগত সাফল্যে রূপ নিয়েছে, তা নিজের চোখে দেখতে পেরে তিনি আনন্দিত। তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে মহাকাশ প্রযুক্তি—বিভিন্ন ক্ষেত্রেই চীনের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অত্যন্ত শক্তিশালী। বিশেষ করে ব্যাটারি প্রযুক্তিকে তিনি বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ক্ষেত্রগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে বৈদ্যুতিক গাড়ি শিল্পেও চীন বিশ্বে অগ্রণী অবস্থানে রয়েছে বলে তিনি জানান। বিজ্ঞান গবেষণায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভূমিকা প্রসঙ্গে নোভোসেলভ বলেন, বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ও সৃজনশীল চিন্তার ক্ষেত্রে মানুষের অন্তর্দৃষ্টি সবসময়ই মূল বিষয় হয়ে থাকবে। তাঁর মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একটি অত্যন্ত শক্তিশালী হাতিয়ার এবং ইতোমধ্যে বিজ্ঞানের একাধিক ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। তবে সৃজনশীল অনুসন্ধানের মূল পথটি ভবিষ্যতেও মানুষের হাতেই থাকা উচিত বলে তিনি মনে করেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার বিষয়ে তিনি বলেন, বিজ্ঞানীরা সবসময়ই নতুন নতুন সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি ব্যবহার করবেন, কিন্তু সেগুলোর ক্ষেত্রে সতর্কতা বজায় রাখা জরুরি। অভিজ্ঞ বিজ্ঞানীদের অবশ্যই সত্য ও অসত্যের মধ্যে পার্থক্য করার সক্ষমতা থাকতে হবে এবং কোনটি বাস্তব বৈজ্ঞানিক ফলাফল আর কোনটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি ‘ভ্রম’—তা শনাক্ত করতে হবে। আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সহযোগিতায় ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাব নিয়েও কনস্টান্টিন নোভোসেলভ উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ভূরাজনৈতিক কারণে অনেক আন্তর্জাতিক সহযোগিতা থমকে যাচ্ছে, যা তাঁকে গভীরভাবে ব্যথিত করে। তাঁর মতে, বিজ্ঞানের অগ্রগতি কখনোই আন্তর্জাতিক সহযোগিতা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। তাই ভবিষ্যতেও বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীদের মধ্যে সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে—এটাই তাঁর আন্তরিক প্রত্যাশা। চীনে তাঁর দীর্ঘদিনের সফর ও কাজের অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে নোভোসেলভ বলেন, চীন এমন একটি দেশ, যেখানে বিভিন্ন সংস্কৃতি পাশাপাশি বিকশিত হয়েছে এবং প্রদেশগুলোর মধ্যেও বড় ধরনের বৈচিত্র্য রয়েছে। গবেষণার ক্ষেত্রেও প্রতিবার নতুন কোনো গবেষণা প্রতিষ্ঠান বা সংস্থায় গেলে তিনি নতুন নতুন ‘লুকানো রত্ন’ এবং অসাধারণ গবেষণাকাজ আবিষ্কার করেন বলে জানান। তাঁর অনেক চীনা বন্ধু রয়েছেন, যাঁদের কেউ কেউ একসময় তাঁর ছাত্র ছিলেন। তাঁদের তিনি অত্যন্ত পরিশ্রমী, সৎ এবং কাজে মনোযোগী হিসেবে বর্ণনা করেন। বর্তমানে তাঁদের গবেষণাগারে গিয়ে তাঁদের কাজ দেখতে পারা তাঁর কাছে সত্যিই প্রশংসনীয় অভিজ্ঞতা। নিজের ৩৬ বছর বয়সে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে তরুণদের জন্য কনস্টান্টিন নোভোসেলভের পরামর্শ হলো—নিজের অন্তরের প্রতি সৎ থাকা এবং নিজের মূল লক্ষ্য ও প্রেরণাকে ধরে রাখা। তিনি বলেন, মানুষ খুব সহজেই নানা ধরনের প্রচার ও সময়ের প্রবণতার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে নিজের পথ থেকে সরে যেতে পারে। কিন্তু বিজ্ঞানচর্চার মূল উদ্দেশ্য হলো এর মধ্য থেকে আনন্দ খুঁজে পাওয়া। তাঁর মতে, এই আনন্দই সবচেয়ে মূল্যবান বিষয়। ভবিষ্যতে মানবজাতির জন্য একটি নতুন উপকরণ তৈরি করার সুযোগ পেলে কনস্টান্টিন নোভোসেলভ এমন একটি উপকরণ তৈরি করতে চান, যা কোনো না কোনোভাবে জীবন্ত ব্যবস্থার মতো আচরণ করবে। তাঁর মতে, এ ধরনের উপকরণ তৈরি করা গেলে জীবন্ত ব্যবস্থাকে আরও গভীরভাবে বোঝার ক্ষেত্রে মানবজাতি আরও এক ধাপ এগিয়ে যেতে পারবে। সূত্র: শিশির, আলিম, আকাশ, চায়না মিডিয়া গ্রুপ।
|