আন্তর্জাতিক: নব্বই বছর আগে, একটি দল শত্রুবেষ্টিত অবস্থায় লং মার্চ শুরু করেছিল। দলের সদস্যদের গড় বয়স ছিল পঁচিশ বছরেরও কম। মানব ইতিহাসে এটি ছিল এক অভূতপূর্ব অভিযান। খাবার নেই, ওষুধ নেই। বরফাবৃত পর্বত ও তৃণভূমি অতিক্রম করে এগিয়ে চলা এই দলের গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবে, এমনটা কেউ বিশ্বাস করেনি। তবুও, ২৫ হাজার মাইল বিপদসংকুল ভূখণ্ড অতিক্রম করে অবশেষে বিজয়ী হয়েছিল তারা।
এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেও সাহসের সঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার সময় এই ছিন্নভিন্ন বাহিনীকে ঠিক কোন জিনিসটা টিকিয়ে রেখেছিল? উত্তরটা লুকিয়ে ছিল এক গভীর বিশ্বাসে—জাতি ও জনগণের স্বার্থকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া এবং ন্যায়ের বিজয়ে দৃঢ় বিশ্বাস রাখা। এটাই লং মার্চ চেতনার মূল ভিত্তি এবং চীনা কমিউনিস্টদের আধ্যাত্মিক বংশধারা উন্মোচনের চাবিকাঠি।
আধ্যাত্মিক বংশধারা: চেতনার শতবর্ষব্যাপী নদী
২০২১ সালে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি বা সিপিসি প্রতিষ্ঠার শতবর্ষে, চীনের শীর্ষ নেতা সি চিন পিং সুসংবদ্ধভাবে ‘চীনা কমিউনিস্টদের আধ্যাত্মিক বংশধারা’ ধারণাটি তুলে ধরেন। এর উৎস হলো ‘চীনা জনগণের জন্য সুখ অন্বেষণ এবং চীনা জাতির পুনরুজ্জীবন’-এর মহান প্রতিষ্ঠাকালীন চেতনা। এই বংশধারার প্রতিটি চেতনাই হলো নানা ঐতিহাসিক ধাপে উৎসারিত একেকটি ‘দুর্বার স্রোত’।
শুরুতে উল্লিখিত ‘মহান লং মার্চ চেতনা’ গড়ে উঠেছিল বিপ্লবী যুদ্ধের বছরগুলোতে রেড আর্মির অগণিত কষ্ট ও বিপদের মধ্য দিয়ে। এটি চিংকাংশান চেতনা এবং ইয়ান’আন চেতনার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। এসব চেতনা জনগণকে একটি নতুন চীন প্রতিষ্ঠার পথে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে সিপিসিকে সমর্থন করে এবং প্রথমবারের মতো জাতির ভিত্তিপ্রস্তরে পার্টির মূল আকাঙ্ক্ষাকে প্রোথিত করার সুযোগ দেয়।
গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার পর জাতীয় নির্মাণের সময়, অন্যান্য দেশের প্রযুক্তিগত প্রতিবন্ধকতার মুখে চীনা গবেষকরা গোবি মরুভূমিতে অ্যাবাকাস ব্যবহার করে পারমাণবিক বোমার তথ্য গণনা করেন। এর মধ্য দিয়ে জন্ম নেয় ‘দুই বোমা, এক স্যাটেলাইট’ চেতনা।
কাউন্টি পার্টি সম্পাদক চিয়াও ইউ লু অসুস্থতা সত্ত্বেও জনগণকে মরুকরণ প্রতিরোধ ও বৃক্ষরোপণে নেতৃত্ব দেন, ভূদৃশ্য পরিবর্তন করেন এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করেন। এর মধ্য দিয়ে জন্ম নেয় ‘চিয়াও ইউ লু চেতনা’।
এই চেতনাগুলো সম্মিলিতভাবে মাতৃভূমি নির্মাণের একটি বাস্তব চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়। এগুলোই নতুন চীনে একটি স্বাধীন শিল্পব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় গতি আনে এবং একইসঙ্গে পার্টি সদস্য ও ক্যাডারদের তৃণমূল পর্যায়ে শিকড় গাড়তে ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করার ভিত্তি মজবুত করে।
১৯৭৮ সালে চীন সংস্কার ও উন্মুক্তকরণ নীতি শুরু করে। এর পর থেকে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, দুর্যোগ ত্রাণ এবং মনুষ্যবাহী মহাকাশযাত্রার চেতনা পর্যায়ক্রমে উদ্ভূত হয়েছে। এগুলো অর্থনৈতিক উন্নয়নের চালিকাশক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছে, যা মানুষের জীবনকে ন্যূনতম জীবনধারণের স্তর থেকে মধ্যম সমৃদ্ধ সমাজে উন্নীত করেছে।
২০১২ সালে চীন নতুন যুগে প্রবেশ করার পর দারিদ্র্য বিমোচনের চেতনা—‘কাউকে পেছনে ফেলে না যাওয়া’; বিজ্ঞানীদের দেশপ্রেমিক উৎসর্গের চেতনা; এবং সিল্ক রোডের চেতনা—পারস্পরিক সুবিধা ও উভয় পক্ষের জন্য লাভজনক সহযোগিতার ধারণা—এই আধ্যাত্মিক পরিমণ্ডলের তাৎপর্য আরও সমৃদ্ধ করেছে।
জনগণের সেবা করার পার্টির মূল যে আকাঙ্ক্ষা সেটাকে অব্যাহত রাখে এসব চেতনা। সেই সঙ্গে পার্টির সদস্য ও ক্যাডারদের দায়িত্ব গ্রহণে অনুপ্রাণিত করে, বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত আত্মনির্ভরশীলতা এবং উচ্চস্তরের উন্মুক্তকরণকে উৎসাহিত করে এবং দেশকে অবিচলভাবে আধুনিকীকরণের এক নতুন যাত্রার দিকে পরিচালিত করে।
এটা স্পষ্ট যে প্রতিটি চেতনাই একটি প্রজন্মের পছন্দ এবং নির্দিষ্ট প্রতিকূলতার প্রতি তাদের প্রতিক্রিয়ার প্রতিনিধিত্ব করে। সম্মিলিতভাবে, এগুলো একটি সম্পূর্ণ মূল্যবোধ ব্যবস্থা গঠন করে, যা চীনা কমিউনিস্টদের ‘আধ্যাত্মিক বংশধারা’।
এটি বইয়ে লেখা কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়, বরং এক শতাব্দীর পরীক্ষা ও প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে সিপিসির অর্জিত আধ্যাত্মিক শক্তি এবং সিপিসির শাসন, জাতীয় পুনরুজ্জীবন ও জনগণকে উন্নততর জীবনের দিকে পরিচালিত করার চালিকাশক্তি।
আধ্যাত্মিক বংশধারা: এক শতাব্দীর পরীক্ষা ও প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে গড়া দল পরিচালনা ও জাতি গঠনের চালিকাশক্তি
‘পরীক্ষা ও প্রতিকূলতা’ হলো আধ্যাত্মিক বংশধারাকে বোঝার একটি পরিভাষা। এর অর্থ হলো, এই বংশধারার প্রতিটি চেতনা কোনো একাডেমিক গবেষণায় সীমাবদ্ধ তাত্ত্বিক ধারণা নয়, বরং অগণিত পরীক্ষা এবং কঠিন উন্নয়ন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বারবার গড়ে ওঠা এক আধ্যাত্মিক স্ফটিকায়ন। এ কারণে, এটি শাসক দলের আত্মশাসন এবং একটি শক্তিশালী জাতি গঠনের জন্য বিশ্বাসের দৃঢ় ‘মেরুদণ্ড’ হিসেবেও কাজ করে।
কয়েক কোটি সদস্যের একটি বিশাল রাজনৈতিক দল পরিচালনার ক্ষেত্রে দলের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি কখনোই বাহ্যিক প্রতিবন্ধকতা ছিল না; বরং ছিল অভ্যন্তরীণ আধ্যাত্মিক শিথিলতা এবং জনগণ থেকে বিচ্ছিন্নতা। আধ্যাত্মিক বংশধারা পার্টির সকল সদস্যের জন্য দৈনন্দিন আত্ম-প্রতিফলনের এক ‘আধ্যাত্মিক দর্পণ’ হিসেবে কাজ করে।
লং মার্চের মহৎ আদর্শ ও বিশ্বাস থেকে শুরু করে জনগণের প্রতি চিয়াও ইউ লুর উৎসর্গ এবং সংস্কার ও উন্মুক্তকরণের সাহসী ও দায়িত্বশীল চেতনা পর্যন্ত—প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে চলে আসা এই কাহিনিগুলো এমন এক ‘কোমল প্রতিবন্ধকতা’ তৈরি করে, যা ব্যবস্থার চেয়ে উষ্ণ এবং আইনের চেয়েও বেশি মর্মভেদী। এগুলো প্রত্যেক পার্টি সদস্যের আত্মপরিচয়ের ধারণাকে পরিমাপ করে—‘আনুষ্ঠানিক হওয়া লক্ষ্য নয়; জনগণের সেবা করাই কর্তব্য।’
এর মাধ্যমে চিন্তার মূল থেকে অলসতা, দুর্নীতি ও আত্মতুষ্টির বিরুদ্ধে একটি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে ওঠে, যা নিশ্চিত করে যে শতবর্ষী পার্টি একটি শান্তিপূর্ণ পরিবেশেও স্বচ্ছ চিন্তাধারা ও প্রাণবন্ততা বজায় রাখবে।
দেশকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে, ১৪০ কোটি মানুষের একটি বিশাল দেশকে দ্রুত আধুনিকীকরণের পথে নিয়ে যাওয়া, পশ্চিমা দেশগুলোর এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে চলা শিল্পায়ন ও নগরায়ণ প্রক্রিয়া কয়েক দশকে সম্পন্ন করা এবং একইসঙ্গে সম্পদ বৈষম্য ও পরিবেশগত শাসনের মতো জটিল বিষয়গুলোর সমাধান করার জন্য শুধু নীতিমালা ও তহবিলের চেয়েও বেশি কিছুর প্রয়োজন।
এর সঙ্গে অনিবার্যভাবে ‘স্বল্পমেয়াদি কষ্ট’ এবং ‘দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ’-এর মধ্যে অগণিত কঠিন সিদ্ধান্ত জড়িত থাকে। আধ্যাত্মিক বংশধারা হলো সেই ‘সামাজিক বন্ধন’, যা এই সমস্যার সমাধান করে। এটি আঞ্চলিক ও শিল্পক্ষেত্রের পার্থক্যকে অতিক্রম করে সম্মিলিত ঐকমত্য গড়ে তোলে এবং অগণিত মানুষকে একটি সাধারণ দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যের জন্য তাদের প্রচেষ্টা, এমনকি জীবন উৎসর্গ করতেও অনুপ্রাণিত করে।
আধ্যাত্মিক বংশধারা: নতুন যুগে নতুন দীর্ঘ পদযাত্রায় মূল্যবোধের দিকনির্দেশনা
এই আধ্যাত্মিক বংশধারার অন্তর্গত সমস্ত চেতনা পর্যালোচনা করলে একটি সুসংগত পথনির্দেশক নীতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে—জনগণকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নীতি।
দীর্ঘ পদযাত্রার সময় গ্রামবাসীদের উষ্ণতা দিয়ে বাঁচাতে রেড আর্মির সেনারা নিজেদের একমাত্র লেপ অর্ধেক কেটে দিয়েছিলেন। সেটা থেকে শুরু করে দারিদ্র্য বিমোচনে ‘কাউকে পেছনে ফেলে না যাওয়ার’ প্রতিশ্রুতি পূরণ এবং পুরনো আবাসিক এলাকার সংস্কার, গ্রামীণ সড়ক নির্মাণ ও চিকিৎসা বীমা পর্যন্ত—প্রতিটি চেতনাতেই প্রোথিত রয়েছে মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের বাস্তব অনুশীলনে। এটিই শাসক দলকে প্রতিটি পরিবারের কাছে তাদের সেবা পৌঁছে দেওয়ার পথ দেখায়।
সি চিন পিং বলেছেন, ‘প্রতিটি প্রজন্মের নিজস্ব দীর্ঘ পদযাত্রা থাকে’ এবং চীনা জনগণকে ‘নতুন যুগের দীর্ঘ পদযাত্রায় চলার’ আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। দল পরিচালনা এবং দেশকে পুনরুজ্জীবিত করার আধ্যাত্মিক চালিকাশক্তি হিসেবে চীনা কমিউনিস্টদের আধ্যাত্মিক বংশধারা স্থানকালকে অতিক্রমকারী এক শক্তি উন্মোচন করে চলেছে এবং ‘নতুন যুগের দীর্ঘ পদযাত্রা’র মাধ্যমে এই যুগের জন্য এক গৌরবময় অধ্যায় রচনা করে যাবে।এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে গড়ে ওঠা এই আধ্যাত্মিক ধারার অবিচল প্রাণশক্তির উৎস এটাই।
সূত্র: রুবি-ফয়সল-লাবণ্য,চায়না মিডিয়া গ্রুপ।