- প্রফেসর ড. আসিফ মিজান
সমকালীন রাজনীতির এক কৌতুকাবহ বয়ানঃ
সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতি এবং গণমাধ্যমের আলোচনা-সমালোচনায় একটি অভূতপূর্ব এবং ঐতিহাসিক অসঙ্গতির অবতারণা হয়েছে। নীলফামারী-৪ আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য হাফেজ আব্দুল মুনতাকিমের একটি সংসদীয় দাবিকে কেন্দ্র করে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা রাজনীতিবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী এবং অপরাধ গবেষকদের জন্য এক নতুন পাঠ্যবস্তু হতে পারে। জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে দাঁড়িয়ে এই জনপ্রতিনিধি দাবি করেছেন যে, তাঁর পিতা ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। অথচ নির্বাচন কমিশনে দাখিলকৃত তাঁর নিজস্ব হলফনামার আনুষ্ঠানিক নথিপত্র বলছে, তাঁর জন্ম ১০ জানুয়ারি, ১৯৮১ সালে। ঐতিহাসিক এবং জীববৈজ্ঞানিক (Biological) এই বিপুল ব্যবধান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের বয়ান-তৈরির সংস্কৃতিকে এক চরম বিদ্রূপের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
ঐতিহাসিক ও জীববৈজ্ঞানিক অসঙ্গতির চুলচেরা বিশ্লেষণঃ
রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বা পারিবারিক আভিজাত্য প্রমাণের তাড়নায় ইতিহাসের তথ্য বিকৃতির ঘটনা নতুন নয়, তবে জীববৈজ্ঞানিক বাস্তবতাকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে এ ধরনের বয়ান নির্মাণ আসলেই নজিরবিহীন। একজন মানুষ ১৯৭১ সালে শহীদ বা মৃত্যুবরণ করার পর, তাঁর মৃত্যুর দীর্ঘ এক দশক (১০ বছর) পর ১৯৮১ সালে কীভাবে তাঁর এক ঔরসজাত সন্তানের জন্ম হতে পারে, তা সাধারণ যুক্তি ও বিজ্ঞানের পরিপন্থী। এই বৈপরীত্যকে কেবল একটি `তথ্যগত ভুল` বা `করণিক ত্রুটি` হিসেবে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই; এটি একটি সুপরিকল্পিত এবং প্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিক মিথ্যারই বহিঃপ্রকাশ। অতীতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একদলীয় বয়ানে `প্যাথলজিক্যাল লায়ার` বা মনস্তাত্ত্বিক মিথ্যাচারের যে চর্চা আমরা দেখেছি, বর্তমান ঘটনাটি তাকে ছাড়িয়ে এক অবাস্তব ও অলৌকিক রূপ পরিগ্রহ করেছে।
জামায়াতে ইসলামীর আদর্শিক রূপান্তর নাকি রাজনৈতিক সুবিধাবাদ?
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ঐতিহাসিক ভূমিকা ও অবস্থান সর্বজনবিদিত এবং তা স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে নথিবদ্ধ। দলটির তৎকালীন নেতৃত্ব এবং আদর্শিক অবস্থান ছিল বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পরিপন্থী। কিন্তু পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের উত্তর-কালে এসে নিজেদেরকে মূলধারার রাজনীতিতে গ্রহণযোগ্য করে তোলার এক চরম তাড়না দৃশ্যমান হচ্ছে।
সংসদ সদস্য আব্দুল মুনতাকিম কর্তৃক তাঁর পরিবারে ৪৭ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা, ৪ জন চাচা এবং ১৯ জন দাদার মধ্যে ১১ জনেরই মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার যে বিপুল পরিসংখ্যান সংসদে উপস্থাপন করা হয়েছে, তা মূলত একটি `রাজনৈতিক ঢাল` তৈরির চেষ্টা। সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী একদা ব্যঙ্গাত্মকভাবে যে `মুক্তিযোদ্ধা তৈরির আজব মেশিন`-এর রূপক ব্যবহার করেছিলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে জামায়াত নেতার এই বয়ান যেন সেই রূপককেই বাস্তব রূপ দিচ্ছে। আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে যেভাবে ক্ষমতার হালুয়া-রুটি এবং দায়মুক্তির জন্য `মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের` তকমা ব্যবহারের হিড়িক পড়েছিল, জামায়াতের বর্তমান রাজনৈতিক কৌশলও একই সিলসিলার অনুকরণ মাত্র।
অপরাধ বিজ্ঞান ও রাজনৈতিক নৈতিকতার সংকটঃ
একজন অপরাধ বিজ্ঞানী ও বিশ্লেষকের দৃষ্টিতে, সরকারি বা রাষ্ট্রীয় ফোরামে এমন অসত্য এবং স্ববিরোধী তথ্য প্রদান কেবল রাজনৈতিক অনৈতিকতাই নয়, বরং নথিপত্র জালিয়াতি বা মিথ্যা হলফনামা দাখিলের মতো আইনি অপরাধের পর্যায়ভুক্ত। যদি হলফনামার তথ্য সত্য হয় (যা আইনত বাধ্যতামূলক), তবে সংসদে দেওয়া তাঁর বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও বানোয়াট। আর যদি তাঁর বক্তব্য সত্য বলে ধরে নেওয়া হয়, তবে হলফনামায় তিনি নিজের বয়স বা জন্মপরিচয় নিয়ে বড় ধরনের জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন। উভয় সংকটের যেকোনো একটিই একজন সংসদ সদস্যের নৈতিক স্খলন এবং আইনগত যোগ্যতা নির্ধারণের জন্য যথেষ্ট।
বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাস নানা চড়াই-উতরাই ও কৌতুকপূর্ণ ঘটনায় সমৃদ্ধ হলেও, `শহীদের দশ বছর পর সন্তানের জন্ম` নেওয়ার মতো এমন অতিলৌকিক ও অবিশ্বাস্য বয়ান সম্ভবত বিশ্ব সংসদীয় ইতিহাসেই বিরল। জামায়াতে ইসলামীর মতো একটি ক্যাডারভিত্তিক ও সুশৃঙ্খল দাবিদার দলের একজন শীর্ষ জনপ্রতিনিধির কাছ থেকে এমন কাণ্ডজ্ঞানহীন বক্তব্য সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির দেউলিয়াত্বকেই ফুটিয়ে তোলে। জাতীয় ইতিহাস, শহীদানদের স্মৃতি এবং জীববৈজ্ঞানিক সত্যকে এভাবে হাস্যরসের উপাদানে পরিণত করার এই প্রবণতা বন্ধ হওয়া উচিত। রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের উদ্দেশ্যে ইতিহাস বিকৃতির এই সস্তা নাটক সচেতন সমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তীব্রভাবে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার যোগ্য।
[লেখক: প্রফেসর ড. আসিফ মিজান, উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয়, সোমালিয়া এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অপরাধ বিশ্লেষক।]